ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনায় বেড়েছে ডাবের চাহিদা। রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা পূরণে স্বজনদের কাছে ডাবের পানি যেন হয়ে ওঠে ভরসার একটি উপায়। আর এই বাড়তি চাহিদার সুযোগে শহরের বাজারগুলোতে বাড়ে ডাবের দামও। নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে অনেকটাই নাগালের বাইরে চলে যায় প্রয়োজনীয় এই ফলটি।
নগরবাসীর অভিযোগ, খুলনা শহর থেকে মাত্র ১৫ থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে ডাব সংগ্রহ করেন। অথচ সেই ডাবই শহরের বাজারে এসে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত পরিবারের জন্য রোগীর প্রয়োজন মেটাতে ডাব কেনাও হয়ে উঠছে বাড়তি আর্থিক চাপ।
এমন পরিস্থিতিতে কম দামে মানুষের ঘরে ডাব পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন খুলনার দুই তরুণ- রিয়াদ হোসেন ও মেহেদী হাসান। মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে তারা চালু করেছেন ‘ডাব ওয়ালা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ। সেখানে অর্ডার করলেই ডাবের পানির আনুমানিক পরিমাণ অনুযায়ী ৯০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে র্যাপিং করা ডাব পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে গ্রাহকের বাসায়। শুধু দাম কম রাখাই নয়, ডাবগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে র্যাপিং করে সরবরাহ করছেন তারা। ফলে গ্রাহককে বাজার থেকে ডাব কিনে এনে দা দিয়ে কাটার ঝামেলাও পোহাতে হচ্ছে না। বাসায় পৌঁছানোর পর শুধু ছুরি দিয়ে ছিদ্র করেই পান করা যাচ্ছে ডাবের পানি।
নগরীর টুটপাড়া এলাকার গৃহিণী মোসা. হাবিবা খাতুন বলেন, আমার বাজার থেকে ডাব কিনে আনার মতো তেমন কেউ ছিল না। ফোন করে আত্মীয়দের ডাব আনতে বলতাম। একদিন ‘ডাব ওয়ালা’ পেজের সন্ধান পাই। সেখানে অর্ডার করি। সন্ধ্যার মধ্যেই তারা আমার বাসায় ডাব নিয়ে আসে। ডাবগুলো র্যাপিং করা ছিল। শুধু ছুরি দিয়ে ছিদ্র করে নিলেই হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাজার থেকে ডাব আনলে দা দিয়ে কাটতে হয়। ডাবের গায়েও অনেক ময়লা থাকে। এখানে সেগুলো পরিষ্কার ও র্যাপিং করা অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। এটা ভালো উদ্যোগ।
উদ্যোক্তা রিয়াদ হোসেন জানান, খুব বেশি পরিকল্পনা করে তারা কাজটি শুরু করেননি। খুলনায় ডাবের চাহিদা বাড়তে থাকায় এবং এর সঙ্গে দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মানুষের কথা চিন্তা করেই আমরা দুজন মিলে উদ্যোগ নিই, সাশ্রয়ী দামে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ডাব পৌঁছে দেওয়ার।
তিনি বলেন, এখন প্রতিদিন আমাদের ডাবের চাহিদা বাড়ছে। এই কাজের মাধ্যমে মানুষের সেবাও হচ্ছে, অন্যদিকে খরচ বাদ দিয়ে আমাদের কিছু লাভও হচ্ছে। আমরা সেবা করতে এসে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছি, আবার মানুষের দোয়াও পাচ্ছি।
জোড়াকল বাজার এলাকার গৃহিনী সোনিয়া রেখা বলেন, ডেঙ্গুর সময়ে রোগীর প্রয়োজনীয় খাবার ও তরল সরবরাহ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের বাড়তি ব্যস্ততার মধ্যেই ‘ডাব ওয়ালা’র মতো উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষ করে যাদের পরিবারের অসুস্থ সদস্যের জন্য নিয়মিত ডাবের প্রয়োজন, তাদের জন্য বাসায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে ডাব পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি হয়ে উঠেছে বাড়তি সুবিধা।
ব্যবসার পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। দুই তরুণের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষের সংকটের সময় একটু ভিন্নভাবে ভাবলেই ব্যবসার পাশাপাশি সেবারও সুযোগ তৈরি করা যায়।
ডেঙ্গুর মৌসুমে যখন প্রয়োজনীয় একটি ফলের দাম অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন ৯০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে ডাব মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে মানবিকতারও একটি ছোট্ট উদাহরণ।