বাগেরহাট:
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও পুকুরে ব্রাঙ্কিওমাইকোসিস (Branchiomycosis) ছত্রাকের সংক্রমণে ফুলকা পচা রোগ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এতে সাদা মাছের পাশাপাশি বাগদা ও গলদা চিংড়িও মারা যাচ্ছে। একের পর এক ঘেরে মাছের মড়কে উৎপাদন নিয়ে চরম শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা। ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করা অনেক খামারি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
বুধবার (১ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হঠাৎ করেই বিভিন্ন ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। উষ্ণ আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাব, পানির স্তর কমে যাওয়া এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়ে ফুলকা পচা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করছেন চাষি ও মৎস্য কর্মকর্তারা।
ফকিরহাট উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় সরকারি নিবন্ধিত ৮ হাজার ৪টি বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এছাড়া নিবন্ধনের বাইরে আরও কয়েক হাজার ঘের ও পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। তবে কতটি ঘেরে এ রোগ ছড়িয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে।
বারাশিয়া এলাকার মাছ চাষি শেখ মনি জানান, এক রাতের মধ্যেই অক্সিজেনের ঘাটতিতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের বাগদা ও গলদা চিংড়ি মারা গেছে।
ঠিকরীপাড়া এলাকার চাষি বাবু ফকির বলেন, এক রাতেই তার প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের সাদা মাছ মারা গেছে। মাছগুলোর ফুলকা সাদা হয়ে গেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মৃত সাদা মাছ পানির ওপরে ভেসে উঠছে, আর চিংড়ি তলায় পড়ে থাকছে।
এলাকার আরও কয়েকজন চাষি জানান, তাদের অনেকের ঘেরেই একই ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে। ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করায় তারা এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ফকিরহাট উপজেলায় বাগদা ও গলদা চিংড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩১৫ মেট্রিক টন এবং সাদা মাছের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ২৩৩ মেট্রিক টন। তবে বছরের এই সময়ে রোগের প্রকোপ বাড়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফকিরহাট কলেজের জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আদিত্য কুমার সরকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মাছের রোগবালাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, অতিরিক্ত ঘনত্বে মাছ মজুদ, পুকুরে জৈব বর্জ্য জমে থাকা এবং পানির মানের অবনতির কারণে ফুলকা পচা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি চাষিদের পরিমিত খাদ্য প্রয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পরিবর্তন এবং প্রতি শতকে ২০০ গ্রাম হারে চুন প্রয়োগের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান।