দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

৩৪ বছরের অচল রাজস্বে গতি: চুকনগর ডাকবাংলোর ‘দখল’ থেকে কোষাগারে ৬ লাখ টাকা

63

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র চুকনগর বাজার। ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত এই জনপদ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যই নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণেও পরিচিত। সেই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ১৯৪১ সালে বাজারের উত্তর প্রান্তে জেলা পরিষদের একটি ডাকবাংলো নির্মিত হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ওই ভবনের ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছিল নানা অনিয়মের অভিযোগ।

ওই ভবনের দ্বিতীয় তলা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে নিচতলায় থাকা দুটি দোকান থেকে বছরের পর বছর কোনো সরকারি রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করেও দীর্ঘ ৩৪ বছর জেলা পরিষদ কিংবা সরকার একটি টাকাও রাজস্ব পায়নি।

সম্প্রতি খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সরকারি সম্পত্তির নথিপত্র পর্যালোচনা করে দীর্ঘদিনের বকেয়া রাজস্ব আদায়ে উদ্যোগ নেন। নিয়ম অনুযায়ী ওই দোকানে ব্যবসা পরিচালনাকারী ব্যবসায়ী রাসেল শেখকে জেলা পরিষদে তলব করা হয়।

জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করলেও দীর্ঘদিন কোনো ভাড়া বা রাজস্ব পরিশোধ করা হয়নি। ভ্যাটসহ তার মোট বকেয়া রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ টাকা।

সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে ব্যবসায়ী রাসেল শেখ বিষয়টি মেনে নেন। পরে গত ৫ জুলাই ব্যাংকের মাধ্যমে চালান কেটে সম্পূর্ণ ৬ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেন। দীর্ঘদিনের বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করায় জেলা পরিষদের প্রশাসক নিজেই তাকে ধন্যবাদ জানান।

এই ঘটনাকে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাদের মতে, আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারি সম্পদের সুরক্ষা এবং রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশাসকের উদ্যোগের প্রশংসা করে মন্তব্য করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত অনিয়মের একটি ক্ষেত্রে অবশেষে সরকারের রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে। তাদের মতে, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এমন উদ্যোগ অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও উদাহরণ হতে পারে।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, আমি আইন ও নিয়ম অনুযায়ী আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। দীর্ঘ ৩৪ বছর সরকারের যে রাজস্ব বকেয়া ছিল, তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করেছি। এটি নতুন ঘর নয়, পুরোনো আমলের ঘর। এতদিন জেলা পরিষদকে কোনো ধরনের রাজস্ব দেওয়া হয়নি। আমরা নোটিশ দিয়ে তাকে ডাকি এবং সরকারি আইন বুঝিয়ে বলি। তিনি বিষয়টি উপলব্ধি করে ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করেন। এজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।

চুকনগর ডাকবাংলোর এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, প্রশাসনিক সদিচ্ছা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ উদ্যোগ থাকলে বহু বছরের অচলাবস্থাও দূর করা সম্ভব। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর সরকারি কোষাগারে রাজস্ব ফেরার এই ঘটনাকে অনেকেই জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।