দীর্ঘদিনের সংঘাত ও উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি টোলমুক্তভাবে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।
রোববার (১৪ জুন) পৃথক ঘোষণায় এ তথ্য জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও শান্তিচুক্তির বিষয়টি প্রচার করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পূর্ণ। সবাইকে অভিনন্দন। আমি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে উন্মুক্ত করার এবং একই সঙ্গে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিচ্ছি।”
ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক মিনিট আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, উভয় পক্ষ লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধে সম্মত হয়েছে।
১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর
শাহবাজ শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে বাস্তবায়নসংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়া ও আলোচনা সম্পন্ন করা হবে।
চুক্তির আইনি বিষয়গুলো নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে হোয়াইট হাউস। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি নিজে ইলেকট্রনিকভাবে অথবা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেন, “এটি শান্তির নতুন এক দিগন্ত। আজ রাতে আমরা বড় একটি পদক্ষেপ নিয়েছি।”
এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিভাবাদি দেশটির আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে এবং রোববার রাত থেকেই মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সংঘাতের পটভূমি
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিরোধ অব্যাহত ছিল। এর ফলে মাঝেমধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে।
লেবানন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ
চুক্তি নিয়ে এখন পর্যন্ত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ কিংবা লেবানন সরকারের কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে শান্তিচুক্তির ঘোষণার দিনই বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
ঘটনার সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, “এই বিশেষ দিনে, যখন আমরা শান্তিচুক্তির এত কাছাকাছি, তখন এ ধরনের হামলা হওয়া উচিত হয়নি। সব পক্ষেরই এখন সংযম দেখানো প্রয়োজন।”
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হতাহতের সংখ্যা
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইরানে ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন বেসামরিক নাগরিক।
এ ছাড়া লেবাননে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ। উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনাসদস্য। পাশাপাশি আরও দুই মার্কিন নাগরিক অন্য কারণে মারা গেছেন।
বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা প্রশমিত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: এনবিসি নিউজ