দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

আনসার সদস্যের ছেলে বাচ্চু, ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম

23

যশোর :

যশোরের কেশবপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান বাচ্চু রহমান ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। আনসার সদস্য বাবার ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট দেখে ছোটবেলা থেকেই পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বছরের পর বছর নিরলস পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের ফলেই আজ তিনি দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চাকরির পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারের শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন।

গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন বাচ্চু রহমান। এর আগে ৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি চালিয়ে যান। একই সময়ে ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও তার মূল লক্ষ্য ছিল পুলিশ ক্যাডার। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

বাচ্চু রহমান যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের আনসার সদস্য নজরুল ইসলাম ও গৃহিণী বিলকিস বেগমের দুই সন্তানের মধ্যে ছোট। পারিবারিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাবা-মা দুই ছেলের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে কখনও আপস করেননি। বাবার সামান্য আয়ের বড় একটি অংশই ব্যয় হয়েছে সন্তানদের শিক্ষার পেছনে।

শিক্ষাজীবনে বাচ্চু রহমান ২০১৫ সালে কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার লক্ষ্য স্থির করেন।

বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “অভাব-অনটনের সংসারেও ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা করেছি। ছোটবেলায় বাচ্চু খুব বেশি পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল না। কিন্তু জেএসসি পরীক্ষার পর থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও অনেক কষ্ট করেছে। আল্লাহ আজ সেই কষ্টের প্রতিদান দিয়েছেন। ছেলের এই সাফল্যে শুধু আমরা নই, পুরো গ্রাম আনন্দে ভাসছে।”

কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, “প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে এমন অসাধারণ সাফল্য অর্জন করায় আমরা গর্বিত। বাচ্চু সবসময় বিনয়ী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মেধাবী ছিল। তার এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করবে।”

নিজের সফলতার পেছনের গল্প তুলে ধরে বাচ্চু রহমান বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি হওয়া যায়। তখনই সিদ্ধান্ত নিই পুলিশ ক্যাডারেই কাজ করব। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নিয়মিত পত্রিকা পড়তাম। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক, সাইবার অপরাধসহ নানা অপরাধের খবর আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তখন থেকেই মনে হয়েছে, এসব অপরাধ প্রতিরোধে সরাসরি কাজ করতে হলে পুলিশই সবচেয়ে কার্যকর জায়গা।”

তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে পুলিশ ক্যাডার শুধু একটি চাকরি নয়, এটি মানুষের সেবার সবচেয়ে বড় সুযোগ। মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে ডাক্তার কিংবা পুলিশের কাছেই যায়। আমি এমন একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হতে চাই, যাকে মানুষ আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখবে। সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।”

বাচ্চুর এই অনন্য সাফল্যে কেশবপুরসহ পুরো যশোর জেলায় আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন শিক্ষক, সহপাঠী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থানীয়রা মনে করছেন, বাচ্চুর এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো কেশবপুরবাসীর গর্ব এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।