নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে ১ হাজার ২২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৭৫৭ জন। গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ এ দুর্যোগের এক সপ্তাহ পরও নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপালে ১ হাজার ২০৪ জন নিহত ও ৪ হাজার ২১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বতে মারা গেছেন ২১ জন এবং নিখোঁজ ৫৪১ জন।
২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এতে লেন্দে খোলায় বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। পরে সেই বাধা ভেঙে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়
দুর্যোগে নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোটসহ কয়েকটি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ভেসে গেছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো এবং উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ঘিরে। নেপালের ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৯৩৩ কর্মীর সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। তাঁদের একটি বড় অংশ কাদামাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়া ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধসে পড়া সুড়ঙ্গ ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে সেখানে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ৯৯৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নদী, ধ্বংসস্তূপ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে তল্লাশি চালাচ্ছে। ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার ও মানবিক সহায়তায় সহযোগিতা করছে।
দুর্যোগে বিদেশি নাগরিকদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপালের হিসাবে শত শত বিদেশি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকরাও রয়েছেন, যাঁরা কৈলাস-মানসসরোবরের পথে ছিলেন। নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত করতে পরিবারগুলোর কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে ভয়াবহ এ দুর্যোগের পর পুনর্বাসন নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। নেপালের প্রায় ২০ হাজার ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা চালু এবং শিশুদের জন্য অস্থায়ী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজও চলছে।
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজদের স্বজনদের অপেক্ষা শেষ হয়নি। রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি টানিয়ে স্বজনেরা দিনের পর দিন সন্ধান করছেন। অনেক পরিবার এখনো প্রিয়জন জীবিত ফিরে আসার আশায় অপেক্ষা করছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপ ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়ছে।