করোনা মহামারির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, তখন ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলে। দীর্ঘ চার বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। তবে চলতি বছরের মধ্যেই যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা মিলছে।
বাংলাদেশও করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০২৩ সালে এই সংকট আরও তীব্র হয়। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক মন্দা ও দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এরই মধ্যে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনীতিতে গতি ফেরার আশা দেখা দিলেও মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা আবারও বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ব্যয়, আমদানি খরচ এবং খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামও বৃদ্ধি পায়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়েছে। যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১১৫ ডলার পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে তা ৭০ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে নেমে এসেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৭ দশমিক ৭০ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৭৩ দশমিক ৭৪ ডলারে অবস্থান করছে।
একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান ইউরিয়াসহ নাইট্রোজেনভিত্তিক রাসায়নিক সারের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমবে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং এলএনজির বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতার থেকে বাংলাদেশে আমদানি হওয়া প্রায় সব এলএনজিই এই পথ ব্যবহার করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে গড়ে ১০ ডলার বৃদ্ধি পেলে দেশের বার্ষিক আমদানি ব্যয় ১ থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়। একইভাবে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি পেলে পেট্রোবাংলার ব্যয়ও কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার বাড়ে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে সেই আশঙ্কা অনেকটাই কমে এসেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি ও সার খাতে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেলে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম কমলে ডলারের চাহিদা হ্রাস পাবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ সহজ হবে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই ব্যয়জনিত। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কমতে শুরু করলে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে এবং খাদ্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্য—সব ক্ষেত্রেই মূল্যচাপ কমবে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় কমলে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে। এতে শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্য হ্রাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। যথাযথ নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতি আবারও গতিশীল হয়ে উঠতে পারে।