দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা: ঘরভাড়া দিতে চুল বিক্রি করলেন রেহানা

23

 বাগেরহাট :

সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আর মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে নিজের সৌন্দর্যকেও তুচ্ছ করতে হয়েছে বাগেরহাটের রামপালের রেহানা খাতুনকে। দুই সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে ঘরভাড়া পরিশোধ করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমানে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নিচে দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই অসহায় মা।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেহানা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনের মধ্যে দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। স্থায়ী কোনো আশ্রয় না থাকায় কখনো পরিচিতদের বাড়িতে, আবার কখনো ভাড়া করা ছোট ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ভাড়া দিতে না পারায় সেই আশ্রয়ও হারাতে হয়েছে তাকে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘরভাড়া বাবদ ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের চুল বিক্রি করেন রেহানা। বর্তমানে রেলব্রিজের পাশে সরকারি জমিতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘর তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি। কয়েক মাস ধরে বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও অর্থের অভাবে ঘরটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ফলে রোদ-বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তার।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, “মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন দেখি তার মাথায় চুল নেই। কারণ জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে জানান, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে তিনি নিজের চুল বিক্রি করেছেন।”

সন্তোষপুর গ্রামের তালেব শেখ বলেন, “রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। তার স্বামী অনেক আগেই দুই সন্তানসহ তাকে ফেলে চলে গেছেন। আমরা গ্রামবাসী সরকারের কাছে দ্রুত অসহায় পরিবারটির জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করার দাবি জানাই।”

স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, “রেহানার জন্য বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে পারলেই ঘরটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব। এলাকার সচ্ছল মানুষ ও প্রশাসন এগিয়ে এলে পরিবারটির মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহানা খাতুন বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাওয়ারও কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”

এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত রেহানা ও তার সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ঘরের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “আমি গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। অসহায় ওই নারী ও তার সন্তানদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

রেহানার এই ঘটনা শুধু একজন অসহায় মায়ের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে যে মা নিজের শেষ সম্বলটুকুও বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছেন, তার কাছে একটি নিরাপদ আশ্রয় আজও অধরা।