দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

প্লাস্টিকের দাপটে ম্লান কেশবপুরের মৃৎশিল্প

60

কেশবপুর :

একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সরা, কলস, জগ, মগ ও থালা-বাসনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। রান্নাঘর থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা কাজে মাটির তৈরি সামগ্রী ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে সময়ের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের সামগ্রী। ফলে যশোরের কেশবপুরে বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে।

তবুও মাটির তৈরি পণ্যের কদর পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কেশবপুরের স্থানীয় বাজারে এখনো ছোট-বড় প্রায় শতাধিক ধরনের মাটির সামগ্রীর বেচাকেনা হচ্ছে। হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব, জগ থেকে শুরু করে পয়সার ব্যাংক—বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছেন মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ীরা।

অল্প আয়ে টিকে থাকার চেষ্টা

৩ সেপ্টেম্বর স্থানীয় বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ব্রু দাস পাল জানান, প্রায় ৮০ বছর ধরে তিনি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার দোকানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০ ধরনের মাটির তৈজসপত্র বিক্রি হচ্ছে। ১০ টাকার পয়সার ব্যাংক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা দামের পানি খাওয়ার জগও রয়েছে। দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত ঝিলে সরা তুলনামূলক বেশি বিক্রি হয়।

তিনি জানান, এসব মাটির সামগ্রীর বড় একটি অংশ যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে আনা হয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও কিছু পণ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিবহন, দোকান পরিচালনা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে দিনে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হয়। এই সামান্য আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হচ্ছে।

কাঁচামালের সংকটে কারিগররা

মৃৎশিল্পের প্রধান কাঁচামাল মাটি। কিন্তু উপযুক্ত দোআঁশ ও এঁটেল মাটি এখন আগের মতো সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে চড়া দামে মাটি কিনে আনতে হচ্ছে কারিগরদের। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে মাটির তৈরি পণ্যের দাম।

বর্ষা মৌসুমেও বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয় কারিগরদের। পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় মাটির তৈরি পণ্য শুকানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। অথচ বর্ষাকালে মাটির তৈরি কিছু নির্দিষ্ট পাত্রের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে।

কেশবপুরে বর্তমানে আলতাপোল পালপাড়া ও ব্রহ্মকাটি—এই দুই গ্রামে বংশপরম্পরায় পাল ও কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ মৃৎশিল্প ধরে রেখেছেন। তবে পেশাটির আয় কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। জীবিকার তাগিদে কেউ অন্য পেশায় যাচ্ছেন, কেউবা শহরমুখী হচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে কারিগর সংকটও প্রকট হচ্ছে।

প্লাস্টিকের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা

স্থানীয় ব্যবসায়ী রতন পাল বলেন, প্লাস্টিকের সামগ্রী তুলনামূলক সস্তা, সহজে বহনযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সাধারণ মানুষ মাটির পাত্রের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে মাটির পণ্যের বাজারও আগের মতো নেই।

তার অভিযোগ, মৃৎশিল্পীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় সহায়তা পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। চাহিদা কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই পেশায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

শখ ও পরিবেশ সচেতনতায় নতুন সম্ভাবনা

তবে মাটির পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। ডুমুরিয়া থেকে কেশবপুর বাজারে মাটির সামগ্রী কিনতে আসা হাবিবুল্লাহ জানান, নিত্যব্যবহারের জন্য নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক হওয়ায় তিনি মাটির তৈরি প্লেট ও মগ কিনছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঘর সাজানোর নান্দনিক প্রবণতার কারণে মাটির তৈরি ফুলদানি, টব, মগ, প্লেটসহ বিভিন্ন পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। আধুনিক নকশা, মানসম্মত পণ্য ও কার্যকর বাজারজাতকরণে গুরুত্ব দেওয়া গেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় করা সম্ভব।

পৃষ্ঠপোষকতা চান মৃৎশিল্পীরা

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার বলেন, মৃৎশিল্প গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার চাপে এ শিল্প হারিয়ে যাওয়া কাম্য নয়। মৃৎশিল্পীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

কেশবপুর নিউজ ক্লাবের সভাপতি মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি কেশবপুরের লোকজ ঐতিহ্যেরও অংশ। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে এ শিল্পকে আধুনিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে হবে। কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং মাটির পণ্যের প্রচার ও বাজারজাতকরণে উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসা জরুরি।

হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা

প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক সামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে মাটির পণ্যের বাজার ধরে রাখা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে মাটির সামগ্রীর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রয়োজন সময়োপযোগী নকশা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উৎপাদন এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা।

মৃৎশিল্পীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কাঁচামালের সরবরাহ এবং স্থায়ী বাজার নিশ্চিত করা গেলে কেশবপুরের হারিয়ে যেতে বসা এ লোকশিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। অন্যথায় প্লাস্টিকের অব্যাহত দাপট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা কুমারদের এ পেশা একদিন শুধু স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিতে পারে।