দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

ব্যাংক’র অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে বড় সংস্কার

24

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে নতুন গাইডলাইনস অন ইন্টারনাল কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইসিএমএস)’ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই নির্দেশিকার মাধ্যমে ২০১৬ সালে জারি করা ইন্টার্নাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কম্প্লায়ান্স (আইসিসি) সংক্রান্ত নির্দেশিকা বাতিল করা হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি  বেসেল কোর প্রিন্সিপলস এবং আন্তর্জাতিক অডিট মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।

‎মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ-২ (বিআরপিডি) এ-সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ব্যাংককে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো নতুন নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

‎বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য, সাইবার ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাড়তি প্রত্যাশার কারণে আগের নির্দেশিকা আর যথেষ্ট ছিল না। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে Basel Core Principles for Effective Banking Supervision (২০২৪) এবং Global Internal Audit Standards (২০২৪) অনুসরণ করা হয়েছে।

‎তিন স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক:

‎নতুন নির্দেশিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “Three Lines of Defense” মডেল বাধ্যতামূলক করা। প্রথম স্তরে থাকবে ব্যবসায়িক ইউনিট, যারা দৈনন্দিন কার্যক্রমে ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করবে। দ্বিতীয় স্তরে থাকবে কমপ্লায়েন্স ও রিস্ক ফাংশন, যারা নীতিমালা বাস্তবায়ন ও তদারকি করবে। তৃতীয় স্তরে থাকবে স্বাধীন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (Internal Audit), যারা পুরো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করবে এবং পরিচালনা পর্ষদকে স্বাধীন মতামত দেবে।

‎আইসিএমএসে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো:

‎নির্দেশিকায় ব্যাংকগুলোর জন্য একটি সমন্বিত ইন্টার্নাল কন্ট্রোল ম্যানেসম্যান্ট সিস্টেম (আইসিএমএস) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় থাকবে ইন্টারনাল অডিট, কমপ্লায়েন্স এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট। ইন্টারনাল অডিটকে আবার অন-সাইট অডিট, অফ-সাইট সার্ভেইলেন্স এবং কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট প্রোগ্রামে (কিউএআইপি)  ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে কমপ্লায়েন্স বিভাগের অধীনে থাকবে কম্প্লায়েন্স ডিভিশন এবং এমআইএস, অ্যানালাইটিকস অ্যান্ড মনিটরিং ডিভিশন।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে জোর:

‎নতুন নির্দেশিকায় প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ও অডিট ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভার্চুয়াল অডিট, তথ্যপ্রযুক্তি (আইএস) অডিট, সমসাময়িক অডিট, ফরেনসিক অডিট এবং হুইসেলব্লোয়ার ফ্রেমওয়ার্ক। পাশাপাশি ডাটা অ্যানালিটিক্স, রেড-ফ্ল্যাগ বিশ্লেষণ, রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা বাড়ছে:

‎নতুন নীতিমালায় পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। পর্ষদকে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে এবং বছরে অন্তত একবার এর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের অবহিত করতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‎‎একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটিকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্যের এই কমিটিতে অন্তত দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখতে হবে এবং তারা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা ও আইন-কানুন প্রতিপালন তদারকি করবেন।

‎ স্বাধীনতা পাচ্ছে ইন্টারনাল অডিট:

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, হেড অফ ইন্টার্নাল অডিট (এইচওএলএ)  সরাসরি বোর্ডের অডিট কমিটির কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন এবং প্রয়োজনে কোনো বাধা ছাড়াই অডিট কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। একইভাবে হেড অফ কম্প্লায়েন্সের (এইচওসি)  জন্যও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের নিয়োগ, মূল্যায়ন ও বদলির ক্ষেত্রেও বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে, যাতে ব্যবস্থাপনার অযাচিত প্রভাব না থাকে।

‎‎ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে গুরুত্ব:

‎বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নতুন আইসিএমএস মূলত রিস্ক বেইসড সুপারভিশন (আরবিএস) বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ব্যাংকগুলোকে তাদের ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাজাতে হবে এবং নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর তথ্যব্যবস্থাপনা (এম আই এস), দ্রুত রিপোর্টিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

‎কেন গুরুত্বপূর্ণ:

‎ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ জালিয়াতি, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অমান্য এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই নির্দেশিকাকে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‎সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, স্বাধীন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং বোর্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামঞ্জস্য আরও জোরদার হবে।