দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

নেপালের বন্যা: জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না

24

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বিশ্বকে আবারও একটি কঠিন বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। এসব দুর্যোগ জাতীয় সীমান্তে থেমে থাকে না, ধনী-দরিদ্র দেশের মধ্যে পার্থক্য করে না। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে কোনো দেশের অবদান সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে সেই দেশ রেহাই পায় না। জলবায়ু পরিবর্তন একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সংকট হলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে এমন দেশগুলোকে, যারা এই সংকট সৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম দায়ী।

নেপাল এই বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বৈশ্বিক নিঃসরণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ দেশটি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, কীভাবে চরম আবহাওয়া অল্প সময়ের মধ্যেই মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে এবং ধ্বংস করতে পারে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকা।

নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান এই সংকটকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার আবাসস্থল নেপাল হিমালয় অঞ্চলের অংশ। বিপুল বরফ ও হিমবাহের মজুদের কারণে হিমালয়কে অনেক সময় ‘তৃতীয় মেরু’ বা থার্ড পোল বলা হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে নেপালের হিমবাহগুলো গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ হারিয়েছে। এর প্রভাব শুধু পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; পানি নিরাপত্তা, কৃষি এবং হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনও এর সঙ্গে জড়িত।

হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে পানির প্রবাহ বেড়ে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ সৃষ্টি হতে পারে। এসব হ্রদ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের ক্ষয় পানি সরবরাহের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ উঁচু পাহাড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব শুরু হয়, তার অভিঘাত বহুদূরের মানুষের জীবন ও জীবিকায় পৌঁছাতে পারে।

সাম্প্রতিক বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ও প্রাণহানির চিত্রও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ এবং উদ্ধার তৎপরতার দৃশ্য উঠে এসেছে। বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়েছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। এই দুর্যোগ শুধু সম্পদের ক্ষতি করেনি; মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

চেন্নাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৫ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় ১৩ হাজার মানুষকে উদ্ধার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২২ হাজার শিশু নিরাপদ পানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সংকটে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবন, একটি জীবিকা এবং একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।

এটাই জলবায়ু পরিবর্তনের মৌলিক অবিচার—যারা এই সংকট সৃষ্টিতে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারাই প্রায়ই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়। দশকের পর দশক ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় অংশের জন্য দায়ী। UNEP Emissions Gap Report 2025 অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টি বৃহত্তম অর্থনীতির জোট জি২০ ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল।

অন্যদিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো তুলনামূলকভাবে কম নিঃসরণকারী দেশগুলো জলবায়ু-সম্পর্কিত বিভিন্ন দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—যে সংকট সৃষ্টিতে অল্প কয়েকটি দেশ ঐতিহাসিকভাবে বড় ভূমিকা রেখেছে, তার ক্ষয়ক্ষতির ভার কি সবাইকে সমানভাবে বহন করতে হবে?

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি ন্যায়বিচার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। নেপালের মতো দেশের জনগোষ্ঠী কয়েক দশকের উন্নয়ন-অর্জন মুহূর্তের একটি দুর্যোগে হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। রাস্তা, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি একটি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে।

বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারের জন্য একটি ঘর বা জীবিকা হারানোর অর্থ হতে পারে বছরের পর বছর আর্থিক ও সামাজিক দুর্ভোগ। দুর্যোগের প্রভাব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুনর্নির্মাণের ব্যয় মেটাতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে হয়।

এ কারণেই জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। বায়ুমণ্ডল রাজনৈতিক সীমান্ত মেনে চলে না। একটি দেশে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে মিশে পৃথিবীর সামগ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এর প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না।

তাই প্রতিটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা করার বিশেষ দায়িত্বও রয়েছে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জলবায়ু ন্যায়বিচার

নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বা অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। তবে শুধু অভিযোজন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে অভিযোজনেরও একটি সীমা রয়েছে।

তাই বিশ্বকে একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ—গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ—কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। শুধু প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণায় নয়, বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।

নেপালের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো পরস্পর-সংযুক্ত জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা ও তাপপ্রবাহ ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। হিমালয়ে সংঘটিত পরিবর্তন নিম্নাঞ্চলের নদী ও পানিব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি দেশের জলবায়ু দুর্যোগ অন্য দেশের জন্যও পরোক্ষভাবে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা ও যৌথ সমাধান। দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, তথ্য আদান-প্রদান, নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সরাসরি অর্থায়ন ও কার্যকর কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু মোকাবিলার কার্যক্রম যেন বক্তৃতা ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বন্যা ও গলতে থাকা হিমবাহের মুখোমুখি মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য আগাম সতর্কবার্তা, সহনশীল জীবিকা, সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সংহতি।

বন্যার কবল থেকে মানুষকে উদ্ধারের দৃশ্য কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়; এটি গোটা বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নেপালের দুর্যোগের প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে এমন মানুষ, যাদের জীবন ও জীবিকা কোনো না কোনোভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের জলবায়ু-দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো দেশের কার্বন নিঃসরণ সামান্য হলেও তার জলবায়ু ঝুঁকি বিপুল হতে পারে। বিপরীতে, বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর উচিত ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো। জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি অসম। নেপালের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপদ দূরত্ব বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক সীমান্ত দেশগুলোকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, নদী ও বৈশ্বিক আবহাওয়াব্যবস্থা পৃথিবীর দেশগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।

তাই জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্বও কোনো সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সম্মিলিত উদ্যোগ, দায়িত্বশীলতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা দান নয়; এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তে সৃষ্ট নিঃসরণ যদি অন্য প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, তাহলে জলবায়ু মোকাবিলার পদক্ষেপ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সংহতিকেও সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে।

নেপালের বন্যাকে তাই একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত—পরিবর্তিত জলবায়ু থেকে কোনো দেশ একা রক্ষা পেতে পারে না, এবং এর পরিণতি মোকাবিলায় কোনো দেশকেই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।