দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

দাকোপে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালে নির্বিচারে মাছ শিকার

27

খুলনা:

খুলনার দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট-বড় মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে এ জালের ব্যাপক ব্যবহার দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা, আর সংকটে পড়ছেন পেশাদার জেলেরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও উপজেলার বিভিন্ন খাল, বিল ও জলাশয়ে অবাধে বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে চায়না দুয়ারি জাল। বিশেষ করে অপেশাদার জেলেরা সহজে বেশি মাছ পাওয়ার আশায় এ জাল ব্যবহার করছেন। এতে মাছের পোনা, মা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী নির্বিচারে নিধন হচ্ছে।

সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন খাল ও জলাশয়ে সারি সারি চায়না দুয়ারি জাল পেতে রাখা হয়েছে। কোথাও পানির নিচে, কোথাও আবার আংশিক পানির ওপরে জাল স্থাপন করা হয়েছে। ছোট ফাঁসের এসব জালে ধরা পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পাশাপাশি ব্যাঙ, সাপ, কুচিয়া, শামুক, কাঁকড়া ও নানা ধরনের জলজ প্রাণী। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পেশাদার জেলেদের দাবি, তারা কখনোই এ ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন না। কারণ এতে মাছের পোনা ও প্রজননক্ষম মা মাছ ধরা পড়ে, যা ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

চালনা খালে প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ শিকার করা জেলে আফজাল শেখ বলেন, “চায়না দুয়ারি জালের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালে জাল ফেললেই এসব নিষিদ্ধ জালে জড়িয়ে যায়। মাছের পোনা থেকে শুরু করে ছোট মাছ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই চালনা খালসহ আশপাশের জলাশয় থেকে দেশীয় মাছ হারিয়ে যাবে।”

বনলাউডোব এলাকার জেলে পঙ্কজ মণ্ডল বলেন, “আমরা পৈতৃক পেশায় মাছ ধরি। মাছের বংশ টিকিয়ে রাখতে পোনা ও মা মাছ ধরি না। কিন্তু অপেশাদাররা নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে সব ধরনের মাছ ধরে ফেলছে। এতে শুধু আমাদের জীবিকাই নয়, পুরো জলজ পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।”

পরিবেশ সচেতন মহলের অভিযোগ, কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর এই ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে এসব জালের বিক্রি ও ব্যবহার চলতে থাকায় দেশীয় মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, “চায়না দুয়ারি জাল সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ। মৎস্য আইনে এর উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। মূলত অপেশাদার জেলেরা এ জাল ব্যবহার করে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এ জালের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু অসাধু ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে এসব জাল ব্যবহার করেন। তবে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে মৎস্য বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, “নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বিভিন্ন জলাশয় থেকে জব্দ করা চায়না দুয়ারি জাল ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মৎস্যজীবীদের সচেতন করতেও কাজ করা হচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দেশীয় মাছের অস্তিত্ব রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃত পেশাদার জেলেদের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে দাকোপের খাল-বিল ও জলাশয় থেকে দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।