দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

জনবান্ধবতা, ব্যবসাবান্ধবতা ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট

এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী

87

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে ‘জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও সরকার যে বাজেট প্রস্তাব করেছে, তা একদিকে সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও গ্রহণ করেছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থে অগ্রাধিকার:

বর্তমান সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমদানিকৃত ১১৩টি পণ্যের রেগুলার ডিউটি প্রত্যাহার, ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক বাতিল এবং ৬৯টি পণ্যের কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ বাজারে পণ্যের মূল্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।

এছাড়া শিশু খাদ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, সকল ধরনের মসলা আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক বাতিল সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা প্রদান কৃষি ও খাদ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করবে।

করজাল সম্প্রসারণ, করের চাপ নয়:

এই বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো জনগণের ওপর নতুন করের বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে করজাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদরা করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছিলেন। সেই বাস্তবতায় ব্যক্তি করদাতাদের টার্নওভার করের আওতামুক্ত সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করায় সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত হবে। এটি সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে আস্থার প্রতিফলন:

বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রতি সরকারের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও টেকসই ভিত্তি প্রদান করতে পারে।

মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব:

প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য করহার ১০ শতাংশ নির্ধারণ। এই সিদ্ধান্ত নতুন উদ্যোক্তাদের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো:

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট কর কাঠামোকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। করহার অপরিবর্তিত রেখে ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে সহজীকরণের উদ্যোগ ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও জটিলতা কমাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতভিত্তিক করহার নির্ধারণের মাধ্যমে কর ব্যবস্থায় একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইটি খাত ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা:

ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার আইটি খাত, স্টার্টআপ এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একাধিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আয় আনার ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি সুবিধা, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত রাখা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য নির্ধারণ দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ফলে এসব নীতি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এসএমই, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পদক্ষেপ:

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে অর্থনীতির প্রাণশক্তি বলা হয়। বাজেটে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত সীমা নির্ধারণ এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা রাখা হয়েছে।

এই উদ্যোগ নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশে এ ধরনের কর সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে গতি আনবে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা:

উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন ও ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ হারে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন।

এ ধরনের কর সুবিধা বিনিয়োগের প্রাথমিক ব্যয় কমিয়ে শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়াবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি খাত এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। করের চাপ না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুল্ক হ্রাস, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব, আইটি খাত ও স্টার্টআপের জন্য প্রণোদনা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা-সব মিলিয়ে বাজেটটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেছে।

আমি মনে করি, এই বাজেট দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এটি শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয় বরং একটি সম্ভাবনাময়, আত্মনির্ভর ও উদ্ভাবনভিত্তিক বাংলাদেশের পথচলার নতুন দিকনির্দেশনা।

—প্রশাসক, জেলা পরিষদ, খুলনা।