দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

সন্তানকে সম্পত্তি দানে পিতা-মাতার সুরক্ষায় সংশোধন হচ্ছে আইন

34

সন্তানকে সম্পত্তি দান বা উপহার দেওয়ার পরও বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ে আইনগত সহায়তা বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও ব্লাস্টের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানান।

আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের দেওয়ানি মামলার বড় একটি অংশ সম্পত্তির বণ্টন ও হিসাব-নিকাশকে কেন্দ্র করে। এ কারণে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মুসলিম আইনে হেবা ও অসিয়তনামা এবং হিন্দু আইনে উইলের মতো সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। বাবা-মা সন্তানদের নামে হেবা করে দিলে অনেক ক্ষেত্রে জীবিত থাকতেই সম্পত্তির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। ফলে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তারা। সন্তানরা যথাযথভাবে দেখাশোনা না করলে বাবা-মা অসহায় পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘গিফট’ বা উপহারের সঙ্গে জীবনস্বত্ব (ইউসুফ্রাক্ট রাইট) রাখার বিধান আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী।

আইনমন্ত্রী বলেন, বাবা-মা যদি এমনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে চান, যাতে জীবদ্দশায় নিজেরাই তা ভোগদখল করতে পারেন, তাহলে গিফটের সঙ্গে জীবনস্বত্ব যুক্ত করা হবে। এর ফলে সম্পত্তি সন্তানদের নামে হস্তান্তর হলেও বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগদখলের অধিকার রাখবেন।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানরা তাদের অনুমতি ছাড়া ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন না। একইভাবে বাবা-মা সম্পত্তিটি বিক্রি করতে চাইলে সন্তানদের অনুমতির প্রয়োজন হবে।

তবে চিকিৎসা বা অন্য জরুরি প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রির প্রয়োজন হলে এবং বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে জেলা জজকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান আইনমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট পক্ষ আবেদন করলে জেলা জজ বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

আসাদুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে অনেক দেওয়ানি মামলা কমে আসতে পারে এবং পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যারও সমাধান হবে।

ব্র্যাক-ব্লাস্টের সঙ্গে আইনগত সহায়তা নিয়ে চুক্তি

অনুষ্ঠানে আইনগত সহায়তা আরও বিস্তৃত করতে ব্র্যাক ও ব্লাস্টের সঙ্গে পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়।

সমঝোতা অনুযায়ী, ব্লাস্টের সহযোগিতায় ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পাইলট ভিত্তিতে কোর্ট প্যারালিগ্যাল নিয়োগের মাধ্যমে শ্রমিকদের আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ব্লাস্ট পরিচালিত সফল মধ্যস্থতাকে আইনগত স্বীকৃতি এবং ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

অন্যদিকে, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনগত সুরক্ষা কর্মসূচি (এসইএলপি)-এর আওতায় পেশাদার মধ্যস্থতাকারীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদান, সফল মধ্যস্থতার আইনগত স্বীকৃতি এবং ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। যৌথ মনিটরিং কার্যক্রমও পরিচালনা করা হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। এর বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার এবং আইনজীবী রয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার। বিপুলসংখ্যক বিচারাধীন মামলা বিচারব্যবস্থার জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মামলাজট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে আইনগত সহায়তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে।

তিনি জানান, বিভিন্ন জেলায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ২০টি জেলায় মামলার হার ৬২ শতাংশের বেশি কমেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আসাদুজ্জামান বলেন, এডিআর ব্যবস্থাকে আরও উৎসাহিত করা হলে একদিকে নতুন মামলা দায়েরের প্রবাহ কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান মামলাজটও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা যাবে।

মামলাজট কমাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়ে গবেষণা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ব্র্যাক ও ব্লাস্টের প্রতি আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী। প্রয়োজন হলে আইনি কাঠামো সংশোধনের বিষয়েও সরকার উদ্যোগ নেবে বলে জানান তিনি।

সবশেষে আইনমন্ত্রী বলেন, সামর্থ্য না থাকায় কোনো মানুষই আইনগত সহায়তার বাইরে থাকবে না। সরকারি লিগ্যাল এইড টিমের পাশাপাশি ব্লাস্ট ও ব্র্যাকের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম এরশাদুল আলম ও মো. খাদেম উল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসাইন, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনগত সুরক্ষা কর্মসূচি এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব এবং ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।