দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

ফেসবুকে অপপ্রচার ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ, সাইবার মামলায় কথিত সাংবাদিক গ্রেপ্তার

39

মোংলা :

ফেসবুকে এক নারী বিউটিশিয়ানের বিরুদ্ধে আপত্তিকর পোস্ট ও ভিডিও ছড়িয়ে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে মোংলায় রেজা মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় মোংলা পৌর শহরের সিঙ্গাপুর মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে মোংলা থানা পুলিশ। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশ জানায়, সাইবার হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার এক নারীর ভাই গত ৩০ আগস্ট বাগেরহাট আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে মোংলা থানাকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর বুধবার পুলিশ সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি রেকর্ড করে।

মামলার আসামিরা হলেন মোংলা পৌর শহরের কবরস্থান রোড এলাকার জিল্লুর সরদারের ছেলে মো. মাসুদ রানা (৪০), বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গিলাতলা এলাকার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে শেখ নাছিরুল হক সোহেল (৪০) এবং মোংলা পৌর শহরের মোর্শেদ সড়ক এলাকার হায়দার আলীর মেয়ে জিনিয়া আক্তার (২৯)।

মামলার বাদী মোংলা পৌর এলাকার শ্রম কল্যাণ রোডের বাসিন্দা মো. আল-আমিন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, প্রধান আসামি মাসুদ রানা নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয় আসামি শেখ নাছিরুল হক সোহেল বাদীর বোনের সাবেক স্বামী এবং তৃতীয় আসামি জিনিয়া আক্তার বাদীর বোনের পরিচালিত বিউটি পার্লারের সাবেক কর্মচারী।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বাদীর বোন কাজী কেয়া মোংলা পৌরসভার কবরস্থান রোড এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ‘কেয়া ব্রাইডাল লুকস বিউটি পার্লার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রধান আসামি মাসুদ রানা ওরফে রেজা মাসুদ দুটি ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে কাজী কেয়াসহ মোংলার বিভিন্ন ব্যক্তি ও নারীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে পোস্ট দিতেন। এসব পোস্টের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও করা হয়েছে।

বিশেষ করে কাজী কেয়াকে বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক দাবি ও অর্থের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, গত ২৮ জুলাই বিকেলে অভিযুক্ত মাসুদ রানা তাঁর ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি থেকে কাজী কেয়ার বিরুদ্ধে একাধিক পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করেন। এসব পোস্ট ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে বলে জানা গেছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে তাদের সামাজিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে। মোংলা পৌর শহর ও উপজেলার আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ একই ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও বাদীপক্ষ দাবি করেছে।

এদিকে রেজা মাসুদ গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েকজন ভুক্তভোগী স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।” তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তার রেজা মাসুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সাইবার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রেজা মাসুদ নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নিজেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মোংলা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিকের সঙ্গে পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ককে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহবুবুর রহমান মানিক অভিযুক্তের স্ত্রীর বড় ভাই।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, পরবর্তীতে ফেসবুককে ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও নারীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগসংবলিত পোস্ট দেওয়া, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাওয়ার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচারের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কোনো ব্যক্তি তাঁর কথায় রাজি না হলে বা অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দিয়ে সম্মানহানির চেষ্টা করা হতো। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও করেছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত রেজা মাসুদ ও তাঁর পরিবারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।