দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

এআই-কানেক্টিভিটি হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ উন্নয়নের হাতিয়ার

38

বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। পাশাপাশি ডিজিটাল খাতে বাড়াতে চায় কর্মসংস্থান। এ জন্য আধুনিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও দেশীয় উদ্ভাবনেও দেওয়া হচ্ছে গুরুত্ব। এসব লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ প্রতিপাদ্যে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় দিনব্যাপী এ আয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং হুয়াওয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট জেসন উর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, আইসিটি সচিব মামুনুর রশীদ ভূঁঞা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারি লক্ষ্যের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক, সুরক্ষিত ও উচ্চগতির ডিজিটাল সংযোগ পৌঁছে দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি ও এআইর আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এ লক্ষ্যে আধুনিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে টেলিকম সচিব ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, ডিজিটাল সক্ষমতায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে, যা এ দশকের বড় চ্যালেঞ্জ। এককভাবে সরকারের পক্ষে এই রূপান্তর সম্ভব নয়; সরকারের কাজ সহায়ক পরিবেশ তৈরি ও বিনিয়োগ করা। সরকারের কর্মপরিকল্পনার মূলনীতিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, কেবল সংযোগ পেলেই হবে না, তা সাশ্রয়ী ডিভাইস, ডাটা এবং স্থানীয় ভাষায় অর্থপূর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি, নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অনুষ্ঠানে আইসিটি সচিব মামুনুর রশীদ ভূঁঞা বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের প্রান্তিক মানুষের সংযোগ নিশ্চিত করতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্টফোনের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এজন্য দেশেই চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে ফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাক বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইদা আফরোজ। আলোচনায় তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তর ও বাস্তবতা, ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে টার্গেট অনুযায়ী অবকাঠামো শক্তিশালী করা, সংযুক্ত সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ নিয়ে তিনি আলোচনা করেন।

দিনব্যাপী এই আয়োজনে ‘ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’, ‘শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক তিনটি পৃথক প্যানেল আলোচনারও আয়োজন করা হয়। বিটিআরসির ইঅ্যান্ডও ডিভিশনের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদের সঞ্চালনায় প্রথম প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন টেলিটক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী, বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইমাদুল রহমান, গ্রামীণফোনের চিফ ইনফরমেশন অফিসার ড. নিরঞ্জন শ্রীনিবাসন, রবি চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার মোহাম্মদ শাহেদুল আলম এবং হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ।

জেসন উ বলেন, ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে হুয়াওয়ে সরকার ও শিল্প খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংযোগ ব্যবস্থা, ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে আমাদের সক্ষমতার মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়াতে, নতুন সেবা উদ্ভাবনে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে আমরা কাজ করতে চাই।’ তিনি মোবাইল নেটওয়ার্ক, পাওয়ার ও অন্যান্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন ও ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেন।

প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইবার সংযোগ ও ৫জির প্রসারের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। উন্নত সেবা ও ডিজিটাল অর্থনীতি জোরদারে সরকার, অপারেটর ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশে ৯৯ শতাংশের বেশি ৪জি কাভারেজ থাকলেও ৫জির পূর্ণ সুফল পেতে এর বিস্তারের পাশাপাশি শিল্প, কৃষি ও আইওটিতে ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে স্মার্টফোনের উচ্চমূল্য, গ্রামীণ পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, টেলিকম সেবায় চড়া কর এবং সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন তারা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. সৈয়দা নওশিন পার্নিনীর সঞ্চালনায় ‘টেককানেক্ট বাংলাদেশ’ সম্মেলনের দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনায় শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন বক্তারা। এই আলোচনায় বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ড. লুৎফা আক্তার, কন্ট্রোলার অব সার্টিফাইং অথরিটিজের (সিসিসিএ) নিয়ন্ত্রক ও যুগ্ম সচিব এ.টি.এম. জিয়াউল ইসলাম, বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসলাম হোসেন, টেলিকম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মির্জা কামাল আহমেদ, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার এন্টারপ্রাইজ বিজনেসের সিটিও কাই লানটিং (ম্যানফ্রেড) এবং ডিএক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও দেওয়ান কানন অংশগ্রহণ করেন।

হুয়াওয়ের প্রতিনিধি মি. ম্যানফ্রেড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই রূপান্তরে ডাটা, নীতি এবং শক্তিশালী প্রযুক্তি অবকাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। আইসিটি বিভাগের মি. জিয়াউল ইসলাম মানবসম্পদ উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য ডাটার স্থায়িত্ব এবং জাতীয় ডাটা গভর্ন্যান্স অ্যাক্টসহ আইনি কাঠামোর সঠিক বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আয়োজনে এবং হুয়াওয়ের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত ‘টেককানেক্ট বাংলাদেশ ২০২৬’ সম্মেলনে ‘এআই’ (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বিষয়ক তৃতীয় প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তাইবুর রহমানের সঞ্চালনায় এ প্যানেল আলোচনায় বৈশ্বিক এআই প্রবণতা, এর প্রভাব এবং বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

দিনের শেষ প্যানেল আলোচনার বিষয় ছিল ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব এবং বাংলাদেশের প্রস্তুতি’। এতে মুল ফোকাস ছিল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক বিস্তার। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তাইবুর রহমানের সঞ্চালনায় এ আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, ক্যাবিনেট ডিভিশনের যুগ্ম সচিব মো. তৌফিকুল ইসলাম, জিএসএমএ এশিয়া প্যাসিফিকের পলিসি অ্যান্ড স্পেকট্রাম স্ট্র্যাটেজির ডিরেক্টর আশীষ গর্গ এবং হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার সিটিও লি জিয়াং (টনি) প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তারা বৈশ্বিক এআই বাস্তবতা, এআই-উপযোগী অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি, এআই গভর্ন্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা ও আস্থা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা নিয়ে আলোচনা করেন।

আলোচক হিসেবে অংশ নিয়ে লি জিয়াং (টনি) বলেন, এআই কর্মসংস্থান ধ্বংস করবে না, বরং কাজের ধরন বদলে দিয়ে স্থানীয় নির্মাতা ও শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া হাসপাতালে এক্স-রে বিশ্লেষণ বা কারখানায় স্বয়ংক্রিয় মাননিয়ন্ত্রণে উচ্চগতির ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই যুগের জন্য দেশে বড় সক্ষমতার ডাটা সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া শুধু অবকাঠামো দিয়ে রূপান্তর সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ উদ্যোগে গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরামর্শ দিয়ে বক্তারা বলেন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে খসড়া এআই পলিসি চূড়ান্ত করা এবং ডাটা ক্লাসিফিকেশন গাইডলাইন চালুর মাধ্যমে সরকারি সেবায় এআই প্রয়োগ ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

দিনব্যাপী এ আয়োজনে ছিল বিভিন্ন খাতে হুয়াওয়ের নিজস্ব প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রদর্শনী। যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট এডুকেশন, ডিজিটাল পাওয়ার, স্মার্টফোন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সমাধান তুলে ধরা হয়।