হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং আঞ্চলিক সংঘাতের অবসানে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা এগিয়েছে। এ যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি আশা করছেন, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) তেহরানের প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যেতে পারে।
নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে ইরানের প্রতিনিধি দলের এবারের সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তেহরানের অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা। এ প্রণালি দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়, ফলে এর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করা হলে যুদ্ধবিরতি ও সংকট নিরসনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর জন্য তেহরান একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিয়েছে। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে এগোনোর সুযোগ তৈরি হবে।
আরাগচি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল আমেরিকান পক্ষ এবং অন্যান্য সব দেশের কাছে এসব শর্ত পৌঁছে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিশ্চিত করা যে, এ বিষয়ে ইরানের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি জানান, তেহরান জোরপূর্বক কোনো সমাধানের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পক্ষে অবস্থান করছে।
আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ যোগাযোগে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য কমিয়ে তেহরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ বের করতে কয়েকটি নতুন ধারণা দিয়েছেন। এসব প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি বৈঠক না হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এর আগেও নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। তবে নতুন সাত দিনের প্রস্তাব সামনে আসার পর এ যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কাতার ও পাকিস্তান এর আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার উদ্যোগেও মধ্যস্থতা করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবকে আগে গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রত্যাখ্যান করলেও চলতি সপ্তাহে আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের মতপার্থক্যের বড় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা।
ইরানের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার মতো বিষয়ও রয়েছে। এর বিনিময়ে তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছে। তবে প্রস্তাবটির শর্ত এবং বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান অচলাবস্থার প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠেছে। একই সঙ্গে হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক না হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
কাতারও হরমুজ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি এপ্রিল থেকে ৯৬ শতাংশ কমে গেছে এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের গ্রাহকদের সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরাগচি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ এখন আগের তুলনায় আরও ‘গুরুতর পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এবং যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনও একাধিক বাধা রয়েছে।