দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

যুব ও নাগরিক সমাজের সংবাদ সম্মেলন: বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ১৫ দফা বাস্তবায়নের দাবি

39

পাইকগাছা :

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিবীক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে যুব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

তারা বলেন, বায়ুদূষণ বর্তমানে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিষ্কার বায়ু কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের মৌলিক অধিকার।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ব্রিদ কোয়ালিশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। ‘ব্রিদিং ইন দ্য গ্রে: ফ্রম পলিসি গ্যাপস টু পাবলিক অ্যাকশন ফর ক্লিন এয়ার’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সূর্যোদয় ইয়ুথ সোসাইটির পরিচালক রায়হান নোমান নূরনবী।

সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার। আলোচনায় অংশ নেন একশনএইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার মো. মাসুদ পারভেজ অভি, স্মার্ট এয়ার বাংলাদেশের অপারেশন ম্যানেজার মো. আশরাফুল ইসলাম প্রমুখ।

মূল বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ একটি অদৃশ্য ও জীবনঘাতী সংকট। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু প্রায় ৫ দশমিক ৫ বছর কমছে এবং প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত রোগে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের মৃত্যু হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তাই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নাগরিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার বায়ু নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়ু গবেষণা সেল গঠনের সুপারিশ করেন তিনি।

অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান বলেন, বায়ু ছাড়া মানুষ এক মিনিটও বাঁচতে পারে না। অথচ বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম। গবেষণা ছাড়া সঠিক নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয়। শুধু সমস্যা তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে টেকসই সমাধানে যুবসমাজকে সক্রিয় অংশীদার করতে হবে। তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।

একশনএইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার মো. মাসুদ পারভেজ অভি বলেন, বায়ুদূষণ বর্তমানে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিষ্কার বায়ু মানুষের সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের মৌলিক অধিকার। বায়ুদূষণের কারণে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি ও কর্মজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৫ দফা দাবি বাস্তবায়ন জরুরি।

১৫ দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. ‘বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২’সহ বিদ্যমান সব নীতি ও কর্মপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন।

২. পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সমন্বয়ে কার্যকর যৌথ টাস্কফোর্স গঠন।

৩. বায়ুদূষণের অভিযোগ জানাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা হটলাইন চালু এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি।

৪. ‘পলিউটার পেজ প্রিন্সিপল’ অনুযায়ী দূষণকারী শিল্প ও স্থাপনার বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ আদায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লাইসেন্স স্থগিত করা।

৫. ঢাকা ও সব বিভাগীয় শহরে পর্যাপ্ত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন ও সেগুলো কার্যকর রাখা।

৬. জনবহুল স্থানে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে রিয়েল-টাইম এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (এ কিউ আই) প্রদর্শন এবং দৈনিক বায়ুমান বুলেটিন প্রকাশ।

৭. নির্মাণ এলাকায় ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

৮. ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।

৯. খোলা জায়গায় বর্জ্য ও প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ।

১০. চরম বায়ুদূষণের সময়ে জনস্বাস্থ্য সতর্কতা জারি এবং ট্রাফিক পুলিশ ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য উপযুক্ত মাস্ক সরবরাহ।

১১. স্থানীয় পর্যায়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাজেট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বৃদ্ধি।

১২. গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছরব্যাপী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা।

১৩. সরকারি নীতি প্রণয়ন ও মূল্যায়নে তরুণ গবেষক এবং বায়ুদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

১৪. সরকারি তদারকি ও বাস্তবায়ন কমিটিতে ব্রিদ কোয়ালিশনসহ যুব প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্বাধীন পরিবীক্ষক অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

১৫. বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরিবীক্ষণ, তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগ ও নিয়মিত পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিষ্কার ও নিরাপদ বায়ু নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।