দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

“মধুপল্লীতে মাইকেল মধুসূদনের ১৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন”

24

কেশবপুর (যশোর) :

বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক, নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম অগ্রদূত এবং মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী সোমবার (২৯ জুন) যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে।

এ উপলক্ষে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের ঐতিহাসিক মধুপল্লীতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সকালে মহাকবির আবক্ষ মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদান স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন খান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রকোনুজ্জামান এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্মৃতিভবনের কাস্টডিয়ান হাসানুজ্জামান। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাহিত্যপ্রেমী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন বলেন, “মাইকেল মধুসূদন দত্ত শুধু একজন কবি নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার অন্যতম পথিকৃৎ। অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি বাংলা কাব্যে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম আজও আমাদের প্রেরণার উৎস। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে। সাগরদাঁড়ি শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক তীর্থস্থান। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম বলেন, “মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি এনে দিয়েছে। তাঁর রচনার ভাষা, গভীরতা ও সৃজনশীলতা যুগে যুগে সাহিত্যপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করবে। তরুণ সমাজকে তাঁর সাহিত্য পাঠে আরও উৎসাহিত করতে হবে, কারণ তাঁর রচনায় ইতিহাস, মানবতা ও দেশপ্রেমের অনন্য শিক্ষা রয়েছে।”

মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্মৃতিভবনের কাস্টডিয়ান হাসানুজ্জামান বলেন, “মহাকবির জন্মভিটা শুধু একটি প্রত্নসম্পদ নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী ও গবেষকরা এখানে আসেন। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য আরও উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিতে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর সৃষ্টিশীলতা, ভাষার শক্তি এবং সাহিত্যের নতুন ধারা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর সাহিত্যচর্চা বাড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

উল্লেখ্য, ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোরের বর্তমান কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর বাবা ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত এবং মা জাহ্নবী দেবী। বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সফল প্রবর্তক হিসেবে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘ব্রজাঙ্গনা’, ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’, ‘কৃষ্ণকুমারী’, ‘পদ্মাবতী’, ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদান আজও সমানভাবে সমাদৃত।

১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মহাকবি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পরও তাঁর সাহিত্য, চিন্তাধারা ও সৃষ্টিশীলতা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস হয়ে রয়েছে।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা মহাকবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁর সাহিত্য, আদর্শ ও সৃজনশীল চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।