দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

জলবায়ু ও রাজনীতি: গাবুরার বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

এস. এম. শাহিন সিরাজ

107

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ গাবুরা আজ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম সামনের সারির অঞ্চল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এই জনপদকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

আইলা, আম্পানসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড় গাবুরার মানুষের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর অব্যাহত ভাঙন এবং জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে বহু পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট লবণাক্ততা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। জীবিকার অনিশ্চয়তায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে জলবায়ু সংকট এখানে শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক সংকটেও রূপ নিয়েছে।

তবে এই বাস্তবতাকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কতটা কার্যকরভাবে এই অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন, সে প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। উন্নয়ন পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অভাব গাবুরার মানুষকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। নির্বাচন অবশ্যই গণতন্ত্রের একটি উৎসব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নির্বাচন কি কেবল দলীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো প্রাধান্য পাবে?

গাবুরার মানুষ এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যারা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে নিরাপদ পানি, টেকসই বেড়িবাঁধ, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে আন্তরিক ভূমিকা পালন করবেন।

মেঘা প্রকল্পসহ চলমান উন্নয়ন উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গাবুরা একটি উপকূলীয় মডেল ইউনিয়নে পরিণত হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, জবাবদিহিমূলক রাজনীতি এবং জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা।

জলবায়ু সংকটের এই সময়ে গাবুরার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রাজনীতিকে হতে হবে মানুষের কল্যাণমুখী। কারণ একটি দুর্যোগপ্রবণ জনপদের জন্য উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি টিকে থাকার লড়াই।