খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রাম। উপকূলের আর দশটি গ্রামের মতোই দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে এখানকার মানুষ। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জলাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, সীমিত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সংকট; সব মিলিয়ে প্রতিদিনের জীবন এখানে সংগ্রামের। তবে সেই বাস্তবতার মধ্যেই এখন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন পানখালীর মানুষ। কারণ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সোমবার ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে ঘোষণা করবেন।
একটি গ্রামের জন্য এমন স্বীকৃতি শুধু নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন ভাবনার সূচনা। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পানখালীকে একটি আধুনিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এই উদ্যোগকে ঘিরেই গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পানখালীর মানুষের জীবন-জীবিকা দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতি ও নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপকূলীয় এলাকার মানুষ হিসেবে তাদের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার নানা ঘাটতি। এখানকার কৃষক, জেলে, দিনমজুর কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- প্রত্যেকের জীবনেই উন্নত সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন। তাই ‘এসডিজি ভিলেজ’ উদ্যোগকে তারা দেখছেন শুধু সরকারি কোনো প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা হিসেবে।
কৃষক মাহবুবুর রহমান ও অরবিন্দ ম-ল, জেলে পরিমল রায়, দিনমজুর আব্দুর রশিদ গাজী এবং গ্রাম্য চিকিৎসক মহিদুল শেখের প্রত্যাশা- পানখালীতে এবার উন্নয়নের বাস্তব পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির আধুনিকায়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে বদলে যাবে তাদের জীবনযাত্রা। তাদের চোখে তাই আজ ১০ আগস্ট শুধু একটি উদ্বোধনের দিন নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর নতুন সম্ভাবনার সূচনালগ্ন।
দাকোপ উপজেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের আলোকে পানখালীকে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের পরিধি বেশ বিস্তৃত। দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো, শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমানো, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, কৃষি ও জীবিকার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মতো বিষয়ও থাকবে উদ্যোগের আওতায়।
অর্থাৎ পানখালীর উন্নয়নকে কেবল রাস্তা, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না; মানুষের জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে উন্নয়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণেই ‘এসডিজি ভিলেজ’ উদ্যোগটি স্থানীয় মানুষের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। দেশে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের পানখালী গ্রাম ছাড়াও রয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়ি এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর গ্রাম।
প্রশাসনের একের পর এক পরিদর্শনকে স্থানীয়রা দেখছেন উদ্যোগটির গুরুত্বের প্রতিফলন হিসেবে। জাতীয় পর্যায়ের একটি পরীক্ষামূলক উন্নয়ন মডেলের অংশ হওয়ায় পানখালী এখন প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রে। পানখালীর মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটা খুব সরল, তারা চান, উন্নয়নের সুফল যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছায়। কৃষক চান আধুনিক কৃষি ও উৎপাদনের সুযোগ। জেলে চান জীবিকার নিরাপত্তা। দিনমজুর চান কাজের সুযোগ। নারীরা চান অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরো শক্ত অবস্থান। শিক্ষার্থীরা চায় মানসম্মত শিক্ষা এবং তরুণরা চায় কর্মসংস্থান। এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ হলে একটি প্রকল্প কীভাবে একটি গ্রামের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে, পানখালী তার উদাহরণ হতে পারে।
খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী দেখছেন বড় সম্ভাবনা। তার আশা, সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে। কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়ার মধ্য দিয়ে পানখালী একটি আধুনিক ও টেকসই গ্রামে পরিণত হবে। তিনি বলেন, আমি গিয়ে গ্রামবাসীর সাথে কথা বলেছি, তাদের সমস্যা শুনেছি, দেখেছি। এই গ্রামবাসীরা কখনো ভাবেননি যে তাদের গ্রাম জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি উন্নয়ন উদ্যোগের অংশ হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে ঘিরে পুরো গ্রাম এখন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নের আলোকে পানখালীকে একটি আধুনিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানখালীর মানুষের স্বপ্ন এখন একটি গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে একটি মডেলের স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে।