একসময় জাতীয় দলের জার্সি খুলে রেখে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। টানা নয় বছরে চারটি বড় ফাইনালে হারের বেদনা আর সহ্য করতে না পেরে ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে চেয়েছিলেন। চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার পর হতাশ কণ্ঠে বলেছিলেন—
“আমার জন্য জাতীয় দল শেষ। আমি সবকিছু দিয়েছি। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা কষ্ট দেয়।”
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর প্রত্যাবর্তনগুলোর একটি অপেক্ষা করছিল তার জন্য। অবসর ভেঙে ফিরে এসে তিনি শুধু আর্জেন্টিনাকেই বদলে দেননি, বদলে দিয়েছেন নিজের ক্যারিয়ারের গল্পও। এরপর আর্জেন্টিনা জিতেছে টানা দুই কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন একমাত্র লিওনেল মেসি।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ইতিহাস গড়া রাত
২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আবারও নিজের কিংবদন্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন মেসি। ৩৯তম জন্মদিনের মাত্র দুই দিন আগে করলেন জোড়া গোল। যদিও ম্যাচের শুরুটা ছিল হতাশার। অষ্টম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি মিস করেন তিনি।
তবে মেসি তো হার মানার মানুষ নন।
ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে নিচু শটে গোল করে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৭তম গোলটি করেন তিনি। সেই গোলের মধ্য দিয়ে ছাড়িয়ে যান জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন।
কিন্তু সেখানেই থামেননি। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে টাইট অ্যাঙ্গেল থেকে আরেকটি অসাধারণ গোল করে নিজের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১৮-তে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা, আর বিশ্ব ফুটবল সাক্ষী হয় আরেকটি ‘মেসি মুহূর্তের’।
বিবিসির ধারাভাষ্যকার স্টিভ বাওয়ারের ভাষায়—
“এটি আরেকটি অমর মেসি মুহূর্ত।”
মারাদোনার দিনে মেসির ইতিহাস
মজার বিষয় হলো, এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় এমন এক দিনে, যেদিনের ঠিক ৪০ বছর আগে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোল করেছিলেন আর্জেন্টিনার আরেক কিংবদন্তি, Diego Maradona।
সেই ঐতিহাসিক দিনের স্মৃতিবিজড়িত মুহূর্তেই জোড়া গোল করে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করে তুললেন Lionel Messi।
রেকর্ড যেন প্রতিদিনের ঘটনা
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। খেলেছেন ২৮টি ম্যাচ। টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার করা পাঁচটি গোলই এসেছে তার পা থেকে।
এছাড়া তিনি এখন—
- বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
- বিশ্বকাপে সর্বাধিক সুযোগ সৃষ্টিকারী খেলোয়াড় (৭৬)।
- বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করা মাত্র তৃতীয় ফুটবলার।
- বিশ্বকাপে সর্বাধিক অ্যাসিস্টদাতাদের তালিকায় মারাদোনার সমকক্ষ (৮)।
- রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, তার ১৮টি বিশ্বকাপ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৩৫ বছর বয়সের পর। বয়স যেন তার কাছে শুধুই একটি সংখ্যা।
নতুন মেসি: অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়
স্প্যানিশ সাংবাদিক Guillem Balague বলেন,
“আমরা মেসির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না। তিনি এমনভাবে রেকর্ড গড়ে চলেছেন যে বিশ্লেষণ করার সময়ও পাওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন,
“এখন মেসি খেলাটা উপভোগ করছেন। শরীরকে এত ভালোভাবে চেনেন যে গতি বা শক্তির ওপর নির্ভর করতে হয় না। শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তা দিয়েই ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করেন।”
সর্বকালের সেরা?
ফুটবলের ‘গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ বিতর্কে নতুন করে আগুন জ্বালিয়েছে মেসির বর্তমান পারফরম্যান্স।
সাবেক ওয়েলস অধিনায়ক Ashley Williams বলেন,
“আমরা হয়তো ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়কে দেখছি।”
সাবেক ইংল্যান্ড মিডফিল্ডার Danny Murphy-এর মতে,
“তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা অসাধারণ। জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং সময়ের ব্যবহার— এটিই তাকে আমার দেখা সেরা খেলোয়াড় বানিয়েছে।”
আর Olivier Giroud মনে করেন,
“তিনি নিজের জীবনযাপন ও ফিটনেস এত ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন যে এখনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে পারছেন।”
মানবিক ভুল, কিংবদন্তির প্রত্যাবর্তন
ম্যাচে পেনাল্টি মিস করার ঘটনাটিও আলোচনায় এসেছে।
মেসি পরে স্বীকার করেন—
“পেনাল্টি মিস করার পর আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। বিষয়টা খারাপভাবে নিয়েছিলাম। তবে সৌভাগ্যবশত আমরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছি।”
এই বিশ্বকাপে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে পেনাল্টি মিস করেছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক পেনাল্টি নেওয়া (৭) ও সর্বাধিক পেনাল্টি মিস করা (৩) খেলোয়াড়ও এখন মেসি।
তবে সেটিই যেন গল্পের শেষ নয়। পেনাল্টি মিসের হতাশাকে জোড়া গোলে রূপান্তর করে আবারও প্রমাণ করলেন— কিংবদন্তিরা ভুল করেন, কিন্তু ভুলের পর কীভাবে ফিরে আসতে হয়, সেটিও তারাই শেখান।
আর্জেন্টিনার ভরসা, ফুটবলের বিস্ময়
আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে। সামনে রয়েছে জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ। সেখানে আরও একটি রেকর্ডের হাতছানি রয়েছে মেসির সামনে।
কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও তার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো অন্য কিছু।
একসময় যিনি হতাশায় জাতীয় দল ছাড়তে চেয়েছিলেন, আজ তিনিই কোটি মানুষের আনন্দের উৎস। মাঠে নেমে এখনও শিশুর মতো ফুটবল উপভোগ করেন, আর প্রতিটি ম্যাচে নতুন করে লিখে চলেছেন ইতিহাস।
মেসির ভাষায়—
“আমি খেলাটা উপভোগ করি। মানুষকে আনন্দ দিতে পারি, সেটাও আমাকে আনন্দ দেয়।”
হয়তো এ কারণেই বয়স, রেকর্ড কিংবা সময়— কোনোটিই তাকে থামাতে পারছে না। ফুটবল বিশ্ব এখনও মুগ্ধ হয়ে দেখছে এক জীবন্ত কিংবদন্তির সোনালি অধ্যায়।