সাতক্ষীরা :
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় বনাঞ্চলের গুরুত্ব তুলে ধরতে সাতক্ষীরায় আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ পরিবেশবান্ধব প্রদর্শনী ও বৃক্ষমেলা। জেলা শহরের শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে সামাজিক বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী এ মেলায় দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে কৃত্রিমভাবে নির্মিত ‘সড়কপথে সুন্দরবন’ নামের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রতিকৃতি।
কপোতাক্ষ নদের প্রবাহ ও বাঁধ বনায়নের আদলে তৈরি কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ ক্যানোপির পাশে প্রতীকীভাবে রাখা হয়েছে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রা হরিণের অবয়ব। উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, বাঁধ সুরক্ষায় ম্যানগ্রোভ বনায়নের গুরুত্ব এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ বলয় গড়ে তোলার বার্তা সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতেই এ বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১০ দিনব্যাপী এ মেলায় ৩৫টি বিশেষায়িত নার্সারি স্টলে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ প্রজাতির চারা প্রদর্শন করা হচ্ছে। এসব স্টলে লবণাক্ততা সহনশীল উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারার পাশাপাশি কার্বন শোষণে কার্যকর বিভিন্ন ফলদ ও কাঠজাতীয় উদ্ভিদও রয়েছে। বিকেলের দিকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য মেলাটি পরিবেশ শিক্ষা ও বৃক্ষপ্রেম তৈরির একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার রাজারবাগান এলাকা থেকে ছেলে আদনানকে নিয়ে মেলা দেখতে আসেন শিক্ষক রেহানা পারভীন। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় গাছের গুরুত্ব শিশুদের হাতে-কলমে শেখাতে এ ধরনের উদ্ভাবনী প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাবার সঙ্গে মেলায় আসা শিশু শিক্ষার্থী মাহিন ইসলাম একটি বিরল প্রজাতির চারা সংগ্রহ করে বাড়ির আঙিনায় লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করে।
‘দ্যা উজ্জ্বল নার্সারি’র স্বত্বাধিকারী রবিউল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, মেলায় মানুষের মধ্যে গাছের প্রতি আগ্রহ বেশ লক্ষণীয়। ফলদ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি অর্কিড ও বিরল প্রজাতির চারার প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। মেলার সময়সীমা আরও এক-দুই দিন বাড়ানো হলে সাধারণ বৃক্ষপ্রেমী ও নার্সারি মালিক—উভয়েই উপকৃত হতেন।
সামাজিক বনাঞ্চল জোন সাতক্ষীরার সহকারী বন সংরক্ষক প্রিয়াঙ্কা হালদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এলাকার জন্য ম্যানগ্রোভ ও সামাজিক বনায়ন প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। পরিবেশ সুরক্ষার এ বার্তা নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই মেলায় ‘সড়কপথে সুন্দরবন’-এর কৃত্রিম আবহ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় শুধু বন বিভাগের ওপর নির্ভর করলে হবে না। প্রতিটি নাগরিককে অন্তত তিনটি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যা ও সুরক্ষায় দায়িত্বশীল হতে হবে। মঙ্গলবার বিকেলে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে মেলা শেষ হবে বলেও জানান তিনি।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানীয় প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সামাজিক বনায়ন ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। শুধু সরকারি উদ্যোগে চারা রোপণ করলেই হবে না; রোপণ করা প্রতিটি গাছের যথাযথ পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও পরিবর্ধন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
এর আগে গত ২ আগস্ট সকালে বর্ণাঢ্য র্যালি ও পরিবেশ সচেতনতামূলক ফেস্টুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় বন কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় উপকূলীয় জলবায়ু অর্থায়ন ও বন সুরক্ষার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
মেলাটি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।