দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

আষাঢ়ের বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে চালনা খালে

28

দাকোপ (খুলনা) :

আষাঢ়ের টানা বর্ষণে খুলনার দাকোপ উপজেলার চালনা পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী চালনা খালে ফিরে এসেছে প্রাণ। চার দিনের টানা বৃষ্টিতে খালের পানির স্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পশুর নদ থেকে নতুন পানির সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ছড়িয়ে পড়েছে খাল-বিল ও জলাশয়ে। আর সেই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তরুণ-যুবক, কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও জাল, বড়শি ও খেওয়া জাল হাতে নেমেছেন মাছ ধরার আনন্দে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চালনা খালপাড় ঘুরে দেখা যায়, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশ উপেক্ষা করে খালের বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরায় ব্যস্ত স্থানীয়রা। কেউ খেওয়া জাল ফেলছেন, কেউ বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন, আবার কেউ দল বেঁধে মাছ ধরার আনন্দ উপভোগ করছেন। অনেকেই ধরা মাছ নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছেন।

চালনা বাজার এলাকার কৃষ্ণপদ বিশ্বাস বলেন, খালটি খননের পর বর্ষাকালে পর্যাপ্ত পানি জমছে। নতুন পানির সঙ্গে দেশীয় মাছও ফিরে এসেছে। শখ করে মাছ ধরতে এসে ভালোই মাছ পাচ্ছি। আগে এই খালে মাছের দেখা মিলত না, এখন আবার পুরনো দিনের মতো পরিবেশ ফিরে এসেছে।

মাছ ধরতে আসা যুবক রসুল বলেন, বৃষ্টি হলেই খাল-বিলে নতুন পানি আসে, তখন মাছও বেশি পাওয়া যায়। আজ বন্ধুদের সঙ্গে এসে টেংরা, গুলে ও কয়েক ধরনের ছোট মাছ ধরেছি। মাছ ধরার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোও দারুণ আনন্দের।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলে বেল্লাল জানান, বর্ষা এলেই খালপাড় যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। মাছ ধরা শুধু জীবিকার বিষয় নয়, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও বিনোদনেরও অংশ। পরিবার-পরিজনের জন্য নিজের হাতে মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ার আনন্দ আলাদা।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ চালনা খালটি ২০২৪ সালে নগরায়ন প্রকল্পের (সিআরডিপি-২) আওতায় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন করা হয়। পশুর নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে খালটি পৌরসভার ৭ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড হয়ে মান্নানের মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত। দীর্ঘদিন দখল ও ভরাটের কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলেও পুনঃখননের পর বর্ষার পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

চালনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, খালটি দখলমুক্ত ও পুনঃখননের ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমেছে। পাশাপাশি কৃষকরা এখন সেচ কাজে খালের পানি ব্যবহার করতে পারছেন। খালটি পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এবং দেশীয় মাছের আবাসও পুনরুদ্ধার হচ্ছে।

দাকোপ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, আষাঢ় মাসে নতুন পানির সঙ্গে দেশীয় মাছ প্রজননের জন্য বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ মাছ ধরবে, সেটি স্বাভাবিক; তবে মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে সচেতনতা প্রয়োজন। প্রজনন শেষে মাছ আহরণ করলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত চায়না দুয়ারি ও অন্যান্য ক্ষতিকর জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জেলেদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, চালনা খালের পুনঃখনন শুধু জলাবদ্ধতা দূর করেনি, বরং দেশীয় মাছের আবাসস্থল ফিরিয়ে এনে মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বর্ষার এই সময় খালপাড়ে মাছ ধরার দৃশ্য যেন আবারও ফিরিয়ে এনেছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য।