দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

“কপোতাক্ষ তীরে ময়লার ভাগাড় থেকে গড়ে উঠল বিনোদনকেন্দ্র”

22
 পাটকেলঘাটা :

একসময় যেখানে ছিল দুর্গন্ধে ভরা ময়লার ভাগাড়, আজ সেখানে প্রতিদিন ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। তালা উপজেলার পাটকেলঘাটার ঐতিহাসিক কপোতাক্ষ নদের তীরে গড়ে ওঠা ‘জলধারা ক্যাফে’ এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম আকর্ষণ। দুই শিক্ষিত তরুণের দূরদর্শিতা, সাহস ও পরিশ্রমে পরিত্যক্ত একটি স্থান আজ পরিণত হয়েছে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক বিনোদনকেন্দ্রে।

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের উদ্যোক্তা শেখ সানজিদুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। শেখ সানজিদুল হক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং আব্দুল্লাহ আল মামুন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনা শেষে দুজনই বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও স্থায়ী সফলতা পাননি। চাকরিজীবনের অনিশ্চয়তা তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

শেখ সানজিদুল হক জানান, চাকরির পাশাপাশি ২০২৩ সালে একটি ইলেকট্রনিক্স ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিস্তি ও বাকিতে পণ্য বিক্রির কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর হতাশ না হয়ে নতুন করে কিছু করার পরিকল্পনা করেন তিনি। একই সময়ে বন্ধু আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে আলোচনা করে কপোতাক্ষ নদের তীরে একটি পরিবেশবান্ধব ক্যাফে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তারা যে জায়গায় ক্যাফে নির্মাণ করেন, সেটি আগে ছিল স্থানীয়দের ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান। নিজেদের শ্রমে পুরো এলাকাটি পরিষ্কার করে বাঁশ, কাঠ ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে নান্দনিকভাবে গড়ে তোলেন ‘জলধারা ক্যাফে’। বর্তমানে এটি পাটকেলঘাটা ইকো পার্কের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়েছে।

প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ক্যাফেটি খোলা থাকে। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে চা, দুধ চা, কফি, ফুচকা, চটপটি, মোমো, রুটি ও বিভিন্ন ধরনের হালকা খাবারের ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক পরিবেশে নদীর পাড়ে বসে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে প্রতিদিনই এখানে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

এই উদ্যোগ শুধু বিনোদনের সুযোগই তৈরি করেনি, সৃষ্টি করেছে নতুন কর্মসংস্থানও। বর্তমানে দুইজন শিক্ষার্থী ক্যাফেতে পার্ট-টাইম কাজ করছেন। এতে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

উদ্যোক্তা শেখ সানজিদুল হক বলেন, “ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু সাহস হারাইনি। আমরা বিশ্বাস করি চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়া উচিত। একজন উদ্যোক্তা নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।”

অন্য উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। যে জায়গাটি একসময় ময়লার ভাগাড় ছিল, সেটি আজ মানুষের আনন্দ ও বিনোদনের কেন্দ্র। ভবিষ্যতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের পাশে দাঁড়াতে চাই।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে যেখানে দুর্গন্ধের কারণে কেউ যেত না, এখন সেখানে প্রতিদিন পরিবার নিয়ে মানুষ ঘুরতে আসছেন। এলাকাটি পরিচ্ছন্ন হওয়ার পাশাপাশি কপোতাক্ষ নদের সৌন্দর্যও নতুনভাবে উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, দুই শিক্ষিত তরুণের এই উদ্যোগ কেবল একটি ক্যাফে প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান এবং স্থানীয় পর্যটন বিকাশের অনন্য উদাহরণ। তাদের এই সফলতা প্রমাণ করেছে—ইচ্ছাশক্তি, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতাকেও সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।