যশোর:
যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের এক অসহায় পরিবার গত ১৬ বছর ধরে লড়াই করে যাচ্ছে দুই প্রতিবন্ধী যমজ সন্তানকে নিয়ে। জন্মের পর থেকেই গুরুতর শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত মাহি ও রাফি আজ ১৬ বছরে পা দিলেও এখনও তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না, কথা বলতে পারে না, এমনকি নিজের দৈনন্দিন কাজও নিজেরা করতে অক্ষম।
কায়বা ইউনিয়নের একটি জরাজীর্ণ দুচালা টালির ঘরে বসবাস করেন দিনমজুর শরিফুজ্জামান মিলন ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মিলন প্রতিদিন দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে পরিবারের ভরণপোষণ করেন। কোনো দিন কাজ পান, কোনো দিন পান না। কাজ থাকলে পরিবারের হাঁড়িতে ভাত ওঠে, আর কাজ না থাকলে ধার-দেনা কিংবা প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রতিদিন ভোর থেকেই শুরু হয় বাবা-মায়ের সংগ্রাম। দুই সন্তানকে বিছানা থেকে উঠানো, গোসল করানো, খাওয়ানো, কাপড় পরিবর্তন করানো, টয়লেটে নেওয়াসহ সব কাজই তাঁদের কোলে করেই করতে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদের ওজন বাড়ায় পরিচর্যার কষ্টও বেড়েছে বহুগুণ। আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, থেরাপি কিংবা সহায়ক উপকরণ কেনাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছোটবেলা থেকেই মাহি ও রাফিকে একই অবস্থায় দেখে আসছেন তারা। এখনও দুই ভাইকে কোলে করে গোসল করাতে হয়, কোলে করে টয়লেটে নিতে হয়। অথচ তাদের চলাচলের জন্য একটি হুইলচেয়ারও নেই। অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত তারা।
মা তাসলিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “একজন মা হিসেবে সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, আমার সন্তানরা কোনো দিন আমাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারেনি। অন্য মায়েদের সন্তানদের স্কুলে যেতে, খেলাধুলা করতে কিংবা মায়ের হাত ধরে হাঁটতে দেখি, তখন বুকটা ভেঙে যায়। আমার দুই ছেলে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের কষ্ট আমি বুঝি, কিন্তু টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা করাতে পারিনি।”
স্থানীয়দের দাবি, সরকার, সমাজসেবী সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে অন্তত দুইটি হুইলচেয়ার, উন্নত চিকিৎসা এবং একটি নিরাপদ বসতঘরের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের জীবন যেমন কিছুটা সহজ হবে, তেমনি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সন্তানদের কোলে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের কষ্টও অনেকটা লাঘব হবে।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে ওয়াহিদ বলেন, “পরিবারটির পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। খুব দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”