দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

মেসির পূর্ণতার গল্প

11

বিদায় বোধ হয় সব সময় সবকিছুর সমাপ্তি নয়! কখনও কখনও তা স্মৃতির সিন্দুকে এক অনন্ত হাহাকার আর ভালোবাসা জমা রাখার নিভৃত, গোপন আয়োজনও; যা পাথেয় করেই হয়তো বাকি জীবনটা অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। লিওনেল মেসিও বুঝি জীবনের গূঢ় বাঁকে দাঁড়িয়ে সেই চিরন্তন সত্যটাই বেছে নিলেন। গতকাল বুধবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে বেনিনের বিপক্ষে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলার পর বিষাদঘন মহালগ্নে তিনি আশ্রয় নিলেন পরিবারের বুকে। একপাশে তাঁর কাঁধ ছুঁইছুঁই বড় ছেলে থিয়াগো, অন্যপাশে চির-সহচরী আন্তোনেলা রোকুজ্জো আর বাকি দুই সন্তান– স্টেডিয়ামের দিকে মুখ ঘুরিয়ে মাঠ থেকে ফিরে প্রস্থান নিলেন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার একুশ বছরের অভ্যাস থেকে।

লুসাইলের সেই কাঙ্ক্ষিত সোনার হরিণ– বিশ্বকাপ, কোপার মরমিয়া উল্লাস আর আলবিসেলেস্তে জার্সির গায়ে খোদাই করা অতিমানবিক কীর্তিগাথা রেখে দিয়ে এলেন ‘মেসিশূন্য’ আর্জেন্টিনার একলা আকাশে। ক্যামেরার লেন্স যখন তাঁর চোখের কোণে জমা হওয়া সেই নোনা জলের শেষ বিন্দুটিকে ছুঁয়ে গেল, তখন স্পষ্ট বোঝা গেল– যিনি কোটি মানুষকে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, তিনিও আজ এক চরম রিক্ততার মুখোমুখি। জামার হাতায় চোখ মুছে তাঁর বিদায়ী স্বরলিপি, ‘আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের ও দুঃখের দিনটি পার করছি। কারণ আজ সেই দিন, যেদিন আমি জাতীয় দল ও আপনাদের সবাইকে বিদায় জানাচ্ছি। জাতীয় দলের এই ঐতিহাসিক জার্সি ও সম্মান রক্ষা করার প্রতিটি মুহূর্তকে আমি মিস করব। তবে এখন থেকে আমি আপনাদের সারিতে, ওপাশে গিয়ে দাঁড়াব।’

আলবিসেলেস্তে জার্সির মায়া কাটিয়ে ওপাশে গিয়ে সাধারণ সমর্থক হওয়ার ঘোষণা দিলেও ফুটবলকে তিনি অবশ্য এখনই বিদায় জানাচ্ছেন না। আটলান্টিকের ওপারে, ইন্টার মায়ামির চেনা গোলাপি জার্সিতে এখনও তাঁর পায়ের জাদু দেখার অপেক্ষায় বুঁদ হয়ে থাকবে গোটা বিশ্ব। মেসি এখন ক্লাব ফুটবলের আঙিনায় খেলবেন শুধুই নিজের আনন্দের জন্য, ফুটবলের আদি ও অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য। দেশের হয়ে ‘আছেন’ থেকে ‘ছিলেন’ হয়ে যাওয়ার পরও মায়ামির সবুজ ঘাসে তাঁর প্রতিটি ছোঁয়া ফুটবল রোমান্টিকদের মনে করিয়ে দেবে– রাজার দেশ বদলেছে, কিন্তু জাদুর মায়া ফুরিয়ে যায়নি! দেশের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলতে নেমেও শেষবারের মতো আকাশি-সাদায় জাদুই দেখিয়েছেন।

মাঠে লিওনেল মেসি যে কেন শুধুই একজন ফুটবলার নন– এক অলৌকিক কিংবদন্তি, তার চূড়ান্ত সাক্ষ্য তিনি রেখে গেলেন বেনিনের বিপক্ষে এই বিদায়ী মঞ্চেও। ৩-০ গোলের ম্যাচটি শুধু স্মরণীয় করে রাখলেন না, বরং চিত্রনাট্যের মতো করে বুনে গেলেন এক পরম বৃত্তপূরণ। অদ্ভুত এক নিয়তি, ম্যাচের প্রথম গোলটি তিনি করালেন কার হাত দিয়ে? নিকোলাস ওতামেন্দি! মেসির মতোই যাঁর আজ আলবিসেলেস্তে জার্সিতে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল। দুই পুরোনো কমরেডের এই শেষ যুগলবন্দি যেন এক প্রজন্মের অবসান। আর ঠিক তার পরেই দ্বিতীয় গোলটি তিনি সাজিয়ে দিলেন তরুণ নিকো পাজের পায়ে, যাঁর চোখের মণিতে ফুটবলবিশ্ব এরই মধ্যে মেসির এক যোগ্য উত্তরসূরির ছায়া দেখতে শুরু করেছে। কে জানে, হয়তো এই পাজের পিঠেই উঠতে যাচ্ছে আগামী দিনের সেই পবিত্র ১০ নম্বর জার্সি! আর নাটকের শেষ অঙ্কটি মেসি লিখলেন নিজের পায়ে। যে পেনাল্টি কিক নিয়ে জীবনের নানা বসন্তে তাঁকে অজস্র তীরবিদ্ধ হতে হয়েছে, সমালোচকদের বিষাক্ত বাণে বিদ্ধ হতে হয়েছে, সেই পেনাল্টি থেকেই স্পট-কিকে বল জাল ছুঁয়ে তিনি যেন নিজের ক্যারিয়ারের সমস্ত অপূর্ণতা আর যন্ত্রণার হিসাব চুকিয়ে দিলেন। বিদায়ের রাতে বেনিন-বধের এই ৩-০ ব্যবধান তাই কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এ এক মহানায়কের নিজের হাতে লিখে যাওয়া নিখুঁত এক মহাকাব্যের শেষ অনুচ্ছেদও।

খেলা শুরুর ঠিক পাঁচ ঘণ্টা আগে থেকেই মূলত মহাকালের সেই বিষণ্ন নাটকের প্রথম অঙ্কটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর্জেন্টিনার ট্রেনিং সেন্টারের প্রবেশমুখে যখন হাজার হাজার ভক্তের সেই উথালপাতাল ভিড় আছড়ে পড়ছিল, গাড়িবারান্দার ওপাশে বসা লিওনেল মেসির চোখের কোণটা তখনই প্রথম আর্দ্র হয়ে ওঠে। তারপর যখন হাইওয়ে ধরে টিম-বাস ছুটছে এস্তাদিও মনুমেন্তালের দিকে, জানালার কাচে মাথা রেখে বাইরে তাকানো জাদুকর আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন সেই অতিমানব, যিনি গত একুশ বছর ধরে গোটা বিশ্বকে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। স্টেডিয়ামের টানেলে ঢোকামাত্রই তাঁকে জড়িয়ে ধরে একটুকরো নিরাপদ পৃথিবী– তাঁর মা, ছায়ার মতো পাশে থাকা স্ত্রী আন্তোনেলা আর অবুঝ সন্তানরা। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার মতো আজন্ম যোদ্ধারা, যারা এই ঐতিহাসিক বিদায়ের সাক্ষী হতে, বন্ধুকে শেষ আলিঙ্গন দিতে গ্যালারি আলো করে এসেছিলেন।

আর মাঠের ভেতর? ওটা তো নিছক কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ওটা ছিল এক ভালোবাসার মানুষের প্রতি ভক্তকুলের রাজকীয় উপাসনা। গ্যালারি থেকে যখন পঁচাশি হাজার কণ্ঠের ‘মেসি… মেসি…’ ধ্বনি কূজনের মতো আছড়ে পড়ছিল, জাতীয় সংগীতের প্রতিটি সুরে মিশে যাচ্ছিল এক অলৌকিক হাহাকার। আর কখনও কি এমন সন্ধ্যা আসবে তাদের জীবনে?

চিত্রনাট্যের সবচেয়ে মায়াবী দৃশ্যটা মঞ্চস্থ হয়েছিল ম্যাচের ঠিক দশম মিনিটে; রেফারি যখন খেলা থামিয়ে দিলেন, পুরো স্টেডিয়াম একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল আর্জেন্টিনার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ‘নম্বর ১০’-কে। প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের বাড়িয়ে দেওয়া লাল গোলাপের শুভেচ্ছা যেন শত্রু-মিত্রের সীমানা মুছে দিল চিরতরে। আর ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই দেখা গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য– খোদ রেফারি এগিয়ে এসে মেসির হাতে তুলে দিচ্ছেন ম্যাচের বল, পকেট থেকে বের করছেন লাল আর হলুদ কার্ড। যেন বলতে চাইছেন, ‘হে জাদুকর, এই নিয়মের খেলা তো আজ থেকে তোমার জন্য শেষ!’ ঠিক তখনই বুয়েন্স আয়ার্সের রাতের আকাশকে চিরে দিয়ে ড্রোনের আলোয় জ্বলে উঠল দুটো অমর শব্দ– ‘গ্রাসিয়াস মেসি’। প্রযুক্তির শরীরে মায়ার প্রলেপ মাখানো মেসির রূপকথা সাজানো ছিল রাতের আকাশে। জাদুকরের পায়ের জাদুর মতোই হাজার হাজার ড্রোন আকাশে এক আলোর নকশিকাঁথা বুনছিল তখন। যে আলোর রোশনাই বুঝিয়ে দিয়েছিল, আলো নিভে গেলেও এই রূপকথার গোধূলি কখনও ফুরাবার নয়।

যে গল্পের শুরুটা হয়েছিল রোজারিওর এক চিলতে ধুলোবালি মাখা গলিতে, এক হরমোনজনিত সমস্যায় ভোগা বিষণ্ন বালকের পায়ে বলের আলতো ছোঁয়ায়, এদিন বুয়েন্স আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্তালের আকাশ ছোঁয়া গর্জনে এসে তার রাজকীয় অবসান হলো। মেসির এই দুই দশকের আন্তর্জাতিক পথচলা তো কেবল কিলোমিটারের মাপে রোজারিও থেকে বুয়েন্স আয়ার্সের দূরত্ব নয়; এ আসলে এক মহাকাব্যের সফল রূপান্তর করার জীবন-যুদ্ধ। সেই ছোটবেলার ‘লা পুলগা’ বা খুদে জাদুকরটি যখন দেশের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে দিতে ফাইনালে হারার কান্না সয়েছেন, ট্রফি না পাওয়ার বিষাক্ত বাণে বিদ্ধ হয়েছেন, তখনও কেউ ভাবেনি এই রূপকথার শেষ অঙ্কটা এত মধুর হবে। রোজারিওর সেই ছটফটে পায়ে আজ ২০৮টি ম্যাচের ক্লান্তি আর ১২৬টি গোলের রাজকীয় অহংকার মিশে আছে বটে; কিন্তু শেষ ম্যাচে এসে যখন তিনি পরম তৃপ্তিতে থিয়াগোর কাঁধে হাত রাখলেন, তখন মনে হলো বৃত্তটা সম্পূর্ণ হলো।

এদিন ম্যাচ শেষের পর যখন উৎসবের আলো একে একে নিভে এলো, তখন মনুমেন্তালের ড্রেসিংরুমের বদ্ধ বাতাসে নেমে এলো এক ভারী নৈঃশব্দ্য। কিছু বিদায় সতীর্থদের আর সতীর্থ রাখে না, তাদের বানিয়ে দেয় একেকজন অভিভাবকহারা ক্রন্দনরত শিশু। তারা শুধু একজন অধিনায়ককে হারাচ্ছেন না; হারাচ্ছেন তাদের শৈশবের রূপকথাকে, মাঠের ভেতরের পরম নির্ভরতাকে। ডি মারিয়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলেন; যেন এক কমরেড অন্য কমরেডের মহানিষ্ক্রমণ দেখছেন গভীর নীরবতায়। সতীর্থদের প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি ভাঙা কণ্ঠের আকুতি মেসিকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল– গত একুশ বছরে তিনি কেবল ট্রফি জেতেননি; জয় করেছেন একেকটা মানুষের হৃদয়।

আর ঠিক তার পরেই এলো সেই চিরস্মরণীয় মুহূর্ত, যখন মাইক হাতে মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন মেসি। চারপাশের গগনবিদারী চিৎকারের মধ্যেও তাঁর বিদায়ী ভাষণের আবহ জুড়ে ছিল এক অপার্থিব মরমিয়া বিষাদ। কাঁপা কাঁপা গলায় যখন তিনি বলে উঠলেন, ‘আজ কিছু বলা সত্যিই খুব কঠিন… আমি মাঠ ছেড়ে যেতে চাইছি না, আমি বিদায় নিতে চাইছি না’– তখন এস্তাদিওর প্রতিটি ঘাসের কণা যেন গুমরে কেঁদে উঠেছিল। কণ্ঠে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল না বিশ্বজয়ের কোনো উদ্ধত আস্ফালন; বরং সেখানে মিশে ছিল বাবার স্মৃতির প্রতি নিবিড় কৃতজ্ঞতা, ইংল্যান্ড ম্যাচের সেই শরীর নিংড়ানো ক্লান্তির স্বীকারোক্তি এবং চিরকাল আর্জেন্টিনার সাধারণ এক সমর্থক হয়ে ওপাশে গিয়ে দাঁড়ানোর এক পরম আত্মত্যাগ। আলো-ছায়ার সেই মায়াবী সন্ধ্যায়, মেসির মুখ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি শব্দ যেন বুয়েন্স আয়ার্সের আকাশ চিরে একেকটা নীল পদ্ম হয়ে ঝরে পড়ছিল কোটি ভক্তের হৃদয়ে। রাজা মঞ্চ ছাড়লেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের সেই শেষ আকুতি ফুটবল রোমান্টিকদের স্মৃতির সিন্দুকে অমর হয়ে রইল চিরকালের জন্য।