দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

বাসাইলে ১০ কোটি টাকার সেতুতে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ, দুদকের অভিযান

42

টাঙ্গাইল :

টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের একটি দল বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটি পরিদর্শন করে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন। এ সময় উপসহকারী পরিচালক মো. বাসেদ আলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে সেতুটিতে অনিয়মের আলামত পাওয়া গেছে। ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে প্রয়োজনের তুলনায় রডের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, সরেজমিনে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। দুদকের বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেবেন। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশনকে বিস্তারিত জানানো হবে। এরপর কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।

বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিদর্শনের সময় সেতুতে ওই বাঁশগুলো পাওয়া যায়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি দেখা গেছে। সেখানে সাটারিংয়ের কাজে বাঁশ ব্যবহারের দৃশ্যও রয়েছে।

জানা গেছে, বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়কের অংশ হিসেবে মরাগাঙ্গী নদীর ওপর ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণকাজ করছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পেয়ে বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। পরে স্থানীয়রা চলে গেলে আবার রাতে কাজ শুরু করে ঢালাই শেষ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এরই মধ্যে সেতুটি পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।

ঘটনা তদন্তে বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম এবং উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন।

এ ঘটনায় বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলম। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসাইল থানায় মামলা হওয়ার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

অন্যদিকে, নির্মাণকাজে নির্ধারিত উপকরণের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় এলজিইডির এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক অফিস আদেশ ও চিঠিতে জানানো হয়, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলম প্রকৌশলীদের অনুপস্থিতিতে এবং কাউকে না জানিয়ে রাতে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টি ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।