ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। এ লক্ষ্যে ইডকলের ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার (ডিআরএস) কর্মসূচিতে ভবিষ্যতে ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর (ডিএ) হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি। রাজধানীতে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ সোলার এক্সপো–২০২৬-এ অংশ নিয়ে নিজেদের দুই দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা ও সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি তুলে ধরছে প্রতিষ্ঠানটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) যৌথ আয়োজনে দেশে প্রথমবারের মতো এ এক্সপো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর প্রতিপাদ্য ‘ছাদের প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগান, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়ান’।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল (২০২৬–২০৩০) বাস্তবায়নে সহায়তা এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি নীতি ও প্রণোদনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এক্সপোর ৯৩ নম্বর স্টলে পদক্ষেপ সৌর প্যানেল, অফ-গ্রিড ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ প্রদর্শন করছে। প্রদর্শিত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ১ দশমিক ৭ কিলোওয়াটের ইনভার্টার, ১২ ভোল্ট ১০০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ও ৬৪ ভোল্ট ১৫০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি এবং ২০০ ও ৩৫০ ওয়াটের সৌর প্যানেল। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে সংস্থাটির পূর্বে বাস্তবায়িত ও বর্তমানে চলমান বিভিন্ন সৌরবিদ্যুৎ এবং এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (ইএসএস) প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হচ্ছে।
২০০৫ সালে সৌরবিদ্যুৎ খাতে কার্যক্রম শুরু করে পদক্ষেপ। ইডকল এবং সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করে প্রত্যন্ত ও বিদ্যুৎসুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কাছে সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে দিয়েছে সংস্থাটি।
পদক্ষেপের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের ১০ জেলায় মোট ৩৬ হাজার ৮৪৩টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ৮২৩টি সোলার হোম সিস্টেম এবং ৩ হাজার ২০টি সৌর সড়কবাতি। জেলাগুলো হলো খাগড়াছড়ি, রংপুর, দিনাজপুর, বরিশাল, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ। কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা থাকায় স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোও এসব ব্যবস্থার মালিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
পরবর্তী সময়ে নিজেদের কার্যক্রমেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়েছে পদক্ষেপ। ২০২২ সালে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে ২৪ দশমিক ০৯ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এটি থেকে বছরে আনুমানিক ৩৩ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া সংস্থাটির শাখা কার্যালয়গুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ ও লিথিয়াম ব্যাটারিভিত্তিক এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে শিবপুর ও গৈলায় দুটি বসতবাড়ি, একটি গবাদিপশুর খামার এবং একটি মসজিদ-মাদ্রাসায় সৌরবিদ্যুৎ ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সমন্বিত চারটি ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এসব স্থাপনার সম্মিলিত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট-পিক।
এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইডকলের ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার কর্মসূচিতে ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে পদক্ষেপ। এ উদ্যোগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আওতায় সংস্থার সদস্য ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরা, উপযুক্ত ছাদ ও বিদ্যুতের চাহিদা চিহ্নিত করা এবং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কারিগরি সেবা ও অর্থায়নের সুযোগের সঙ্গে সম্ভাব্য গ্রাহকদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পদক্ষেপের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান বলেন, ‘জাতীয় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জনে পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এবং বিস্তৃত সদস্যভিত্তিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সম্ভাবনা তুলে ধরাই এবারের অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য।’
উল্লেখ্য, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা বিশেষ হারের বিষয়টিও এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। এ-সংক্রান্ত বিদ্যুৎ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫-এর শর্ত পূরণ করে যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ শুরু করবেন, তাঁরা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন। ১৮ সেপ্টেম্বরের সরকারি স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ও ব্যাটারি ছাড়া উভয় ধরনের যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ সুবিধা প্রযোজ্য।