দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

মালয়েশিয়ায় কূটনৈতিক সাফল্য, চীনে অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন অধ্যায়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সফর

8

‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’ জুলিয়াস সিজারের এর ঐতিহাসিক উক্তির সঙ্গে তুলনা করেই অনেকেই মূল্যায়ন করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের-এর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই তিনি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাত্র ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত নিবিড় সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, দুই দেশের মধ্যে ৯টি বিষয়ে ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যা আগামী দিনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

লালগালিচায় অভ্যর্থনা, উষ্ণ কূটনৈতিক সূচনা

রোববার রাতে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এটি ছিল জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর।

পরদিন সকালে পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম-এর সঙ্গে একান্ত ও সীমিত পরিসরের বৈঠকে মিলিত হন তিনি। বৈঠকে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

তিন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র

দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল স্বাক্ষর ও বিনিময় হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)
  • বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে দুটি এক্সচেঞ্জ অব নোটস (ইওএন)
  • মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা শুরুর জন্য টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর)

এই উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মধ্যাহ্নভোজ ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের বার্তা

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁর সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার শিল্পীরা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন এবং শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ পরিবেশন করে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে মালয়েশিয়ার শিশু-কিশোররা দুই দেশের জাতীয় পতাকা হাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানায়। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

মালয়েশিয়ার করপোরেট জায়ান্টদের সঙ্গে বৈঠক

সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি ছিল কুয়ালালামপুরের শাংগ্রি-লা হোটেলে মালয়েশিয়ার পাঁচটি শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক।

বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়ে ঐকমত্য

দুই নেতা জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার আরও সক্রিয় ভূমিকা কামনা করে বাংলাদেশ।

চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী

মালয়েশিয়া সফর শেষ করে সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের বন্দরনগরী ডালিয়ান এর উদ্দেশে রওনা হন। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের আমন্ত্রণে তিনি চার দিনের সরকারি সফরে দেশটিতে অবস্থান করবেন।

ডালিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান লিয়াওনিং প্রদেশের ভাইস গভর্নর বাই ইং, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও এন এবং চীনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

সামার ডাভোসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

২৩ ও ২৪ জুন প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘সামার ডাভোস’ নামে পরিচিত ‘নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় । বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এই সম্মেলনে তিনি জলবায়ু নেতৃত্ব, বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন।

বিশেষ করে “পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব” শীর্ষক অধিবেশনে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেইজিংয়ে বিনিয়োগ কূটনীতি

২৫ জুন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে প্রায় ১০০ জন চীনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী অংশ নেবেন। সেখানে বাংলাদেশের শিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হবে।

এছাড়া বিভিন্ন চীনা শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

লি কিয়াং ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক

২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকের পর প্রায় ১০টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরদিন ২৬ জুন তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সফরের তাৎপর্য

বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একদিকে যেমন মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মালয়েশিয়া সফরের কূটনৈতিক সাফল্য এবং চীন সফরের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অর্জন বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি ও উন্নয়ন কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

এই সংস্করণটি সংবাদপত্রের বিশেষ প্রতিবেদন, ম্যাগাজিন ফিচার বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী প্রকাশনার জন্য উপযোগী করে সাজানো হয়েছে।