যশোর:
যশোরের কেশবপুরে কয়েকদিনের টানা বর্ষণে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও নিচু জমি পানিতে তলিয়ে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় থাকা ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নদী ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে কেশবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে। এতে জনজীবনের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সরেজমিনে শুক্রবার কেশবপুর পৌরসভা, পাঁজিয়া, সুফলাকাটি ও গৌরীঘোনা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনা, বসতঘর, কাঁচা রাস্তা, পুকুরপাড়, বাগান এবং নিচু জমিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক এলাকায় মানুষকে প্রয়োজনীয় কাজে বের হতে পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কর্মজীবী মানুষকেও চরম ভোগান্তি নিয়ে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কেশবপুর পৌরসভার ১ নম্বর ভবানীপুর, ৪ নম্বর ওয়ার্ড, ৫ নম্বর আলতাপোল এবং ৭ নম্বর মধ্যকুল এলাকা। এসব এলাকায় অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে ড্রেন পরিষ্কার না করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ফলে ড্রেন উপচে নোংরা পানি ও বর্জ্য বাসাবাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়েছে।
পৌর শহরের বিভিন্ন দোকানপাট, গুদাম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকের পণ্যসামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, বছরের পর বছর ধরে ড্রেন ও খাল-নালার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। শহরের বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলা হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ ড্রেন আবর্জনা ও পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ড্রেনের নিচের অংশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে থাকায় পানিপ্রবাহ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে কৃত্রিম বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
পৌর এলাকার অনেক পরিবারের রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহ করতেও সমস্যায় পড়েছে। নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কাঁচা রাস্তা পানিতে ডুবে ও কাদায় পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় মোটরসাইকেল, ভ্যান, রিকশাসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভবানীপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। ড্রেনগুলো বছরের পর বছর পরিষ্কার করা হয় না।”
মধ্যকুল এলাকার গৃহবধূ শিউলি খাতুন বলেন, “রান্নাঘরে পানি উঠে গেছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। রাতে ঘুমাতেও ভয় লাগে, যদি আরও পানি বাড়ে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, “দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিবার বর্ষা এলেই একই সমস্যা হয়। স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।”
স্থানীয়দের মতে, কেশবপুরে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা, খাল-নালা দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় জলাবদ্ধতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
এদিকে কৃষকরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মাছের ঘের, সবজি ক্ষেত এবং আমন ধানের জমি পানিতে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। নদ-নদী ও খাল দিয়ে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত খাল-নালা খনন, ড্রেন পরিষ্কার, স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী দিনের ভারী বর্ষণে কেশবপুর আরও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হবে এবং জনজীবন সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।