প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, তাদের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও পরিবেশ সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়াই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিপাদ্য হলো—‘জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো’। এর মাধ্যমে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা, আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা স্বাস্থ্যচর্চার গুরুত্বকে সামনে আনা হয়েছে।
বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্তমান পরিস্থিতি
বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দেশ বাংলাদেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ। তবে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
দেশের প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক সুযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়।
সংবিধানে সমতার অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করে। তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে এখনও নানা আলোচনা ও দাবি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিদ্যমান কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বিষয়টিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে ২৯টি সহিংসতার ঘটনায় ৩২ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক চাপ, প্রতিশোধের আশঙ্কা, আইনি সহায়তার সীমিত সুযোগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকটের কারণে অনেক ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা, আইনি সুরক্ষা এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।
বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা
‘বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত’—এই বাস্তবতা সহিংসতার শিকার অনেক মানুষের ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তদন্তে বিলম্ব, প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বিচারপ্রাপ্তির পথে বাধা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সহজলভ্য আইনি সহায়তা ও কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন
১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পরও এর বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করা এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান।
আদিবাসী প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে চুক্তির বিভিন্ন অঙ্গীকার দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অধিকতর অংশগ্রহণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভূমি অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ভূমির অধিকার সুরক্ষা। বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি নিয়ে বিরোধ, মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত জটিলতা এবং আইনি সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা তাদের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমি-সংক্রান্ত ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সমতলের আদিবাসীদের ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবিও দীর্ঘদিনের।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ
আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি।
করণীয়
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—
- ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা করা।
- আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর জন্য বিশেষায়িত আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
- অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
- শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানো।
- মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ ধারাগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপ জোরদার করা।
- জাতীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের শক্তি
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য অবদান রেখেছেন।
তাই তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার সংরক্ষণকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর দাবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নতুন করে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বৈচিত্র্যকে সম্মান করে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হতে পারে এ দিবসের মূল শিক্ষা।