দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

সাতক্ষীরায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা, ফজলুল হক আমিনী গ্রেফতার

23

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালিগঞ্জ থানার কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, ‌‘রাত ১১টার দিকে পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে এই মামলার দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।’

গত সোমবার শামীম (৩৮) ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য আছে, এমন অভিযোগ উঠলে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথম মারধর করা হয়।

পরদিন মঙ্গলবার বিকালে তিনি স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তখন একদল লোক চেম্বার থেকে শামীমকে বের করে তাকে আবার মারধর করে। পরে পুলিশ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে রাতে মিছিল নিয়ে হাসপাতালে হামলা হয়। সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার পেটানো হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীম মারা যান।

শামীম হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়।

এর আগে বার বার মব সৃষ্টি ও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোন ধরনের শাস্তি না পাওয়ায় আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক নৃশংস মব তৈরি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন ফজলুল হক আমিনী। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া এলাকায় তিনি হয়ে উঠেছেন আরও বেশি বেপরোয়া। এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় মব বা বিচারবহির্ভূত নির্যাতনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন এবং আরও বেপরোয়া রূপে ফিরে এসেছেন বলে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে মব সৃষ্টি করে পারুলিয়ার শহিদুল ইসলাম নামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি; একই বছরের অক্টোবর মাসে সোহাগ হোসেন নামের আরেক যুবকের বাড়িতে মব তৈরি করে চালানো হয় ভয়াবহ গণপিটুনি। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, পারুলিয়া ১ নম্বর ইউনিয়নের এক সদস্যের বিরুদ্ধেও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গণপিটুনির মতো জঘন্য ঘটনা ঘটানো হয়। এসব প্রতিটি লোমহর্ষক ঘটনায় মূল নেতৃত্ব বা উসকানিদাতা হিসেবে ফজলুল হক আমিনীর নামই বারবার উঠে এসেছে।

একাধিক মব সৃষ্টির হুতা ফজলুল হক আমিনী দাবি করেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন। তবে পারুলিয়ার এক যুবক আল্লাহ, রাসূল ও কোরআন-হাদিস নিয়ে কটূক্তি করেছে দাবি করে তিনি জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে তিনি নিজের জায়গা থেকে সবসময় নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এর আগের ঘটনাগুলোতেও
যে তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। ফেসবুক এবং লাইভে স্ট্যাটাস দিয়ে লোক জড়ো করে এই বিচারবহির্ভূত মব সৃষ্টির কথা তিনি স্পষ্ট স্বীকার করেন। প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে ধরলে তার কোনো আপত্তি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পরিণামে তার ফাঁসি বা জেল হলেও তার কোনো আফসোস নেই।
নিজের সামাজিক ও পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে তিনি পারুলিয়া বাজারের গরু-ছাগল জবাইয়ের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং বিভিন্ন মসজিদে ইমামের প্রক্সি দিয়ে থাকেন বলে জানান। ইসলাম ও রাসূলের অবমাননার নামে তার এই বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও ক্ষোভ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।
শামীম হত্যার ঘটনায় তাকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করার পর থেকে তাকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করে তার পক্ষে পাবলিক সেন্টিমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি করেন নিহত শামীমের পরিবার।

এই ঘটনায় মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি কখনোই রাষ্ট্রের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। ফজলুল হক আমিনী যে দুঃসাহস ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র যদি এখনই জোরালো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এ ধরনের মব সন্ত্রাস বারবার ঘটতেই থাকবে, যা আমিনী এর আগেও ঘটিয়েছেন। এই ঘটনার মাধ্যমেই পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে তিনি আইনকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না। তিনি যে ভাষাতেই সাফাই গান না কেন, মূলত তিনি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড বা বিচারবহির্ভূত শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। যা তাকে একজন সঘোষিত অপরাধীতে পরিণত করেছে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত তাকে কোনোভাবেই ছাড় না দেওয়া।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ ইতোমধ্যে প্রধান আসামীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে তৎপর রয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দ্রুতই বাকি আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানান তিনি।