দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবন

রুটি-রুজির আশায় প্রস্তুতি জেলেদের, সঙ্গে বনদস্যু আতঙ্ক

22

 কয়রা :

টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামীকাল ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। প্রজনন মৌসুমে মাছ, কাঁকড়াসহ জলজ প্রাণীর বংশবিস্তার নির্বিঘ্ন রাখতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পর্যটকসহ সব ধরনের মানুষের প্রবেশ এবং মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ রেখেছিল বন বিভাগ। দীর্ঘ বিরতির পর সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়ায় উপকূলীয় জেলেপল্লিতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে জীবিকার আশার পাশাপাশি বনদস্যু ও জলদস্যু আতঙ্কও তাড়া করছে বনজীবীদের।

নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবর পেয়ে কয়রার মহেশ্বরীপুর, কয়রা, উত্তর বেদকাশী ও দক্ষিণ বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার জেলেরা বনে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কেউ পুরোনো নৌকা মেরামত করছেন, কেউ নৌকায় নতুন কাঠ লাগাচ্ছেন। আবার কেউ জাল সেলাই, দড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দীর্ঘ তিন মাসের বেকারত্ব কাটিয়ে আবারও নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে সংসারের চাকা সচল করার স্বপ্ন দেখছেন তারা।

কয়রার ৫ নম্বর গ্রামের জেলে রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রায় দুই যুগ ধরে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি। বন বন্ধ থাকলে আমাদের আয়ের আর কোনো পথ থাকে না। গত তিন মাস খুব কষ্টে দিন পার করেছি। পর্যাপ্ত কোনো সহায়তাও পাইনি। ১ সেপ্টেম্বর বন খুললে আবার বনে নামতে হবে। কিন্তু বনদস্যুদের আতঙ্কে চিন্তা হচ্ছে—বনে গিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারব তো?”

বনে নামার আগেই ঋণের বোঝা

জেলেদের বনে যাওয়ার প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঋণের বোঝাও। স্থানীয় একাধিক জেলে ও বনজীবী জানান, চাল-ডালসহ প্রয়োজনীয় খাবার, নৌকা বা ট্রলারের জ্বালানি, নৌকা মেরামত, নতুন জাল, পাস-পারমিটসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে একটি নৌকা নিয়ে বনে নামতেই ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আগাম খরচ হয়। এসব অর্থের বড় অংশই স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংগ্রহ করতে হয়।

ফলে বনে মাছ-কাঁকড়া পাওয়া না গেলে কিংবা কোনো কারণে অভিযান ব্যর্থ হলে ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে পড়ে। তারপরও জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই সুন্দরবনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

প্রকৃতির ভয় পেরিয়ে এখন দস্যু আতঙ্ক

সুন্দরবনে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের জন্য ঝুঁকির শেষ নেই। নদী-খালে কুমিরের ভয়, বনের ভেতরে বাঘের আতঙ্ক, আর গাছের ডালে বিষধর সাপের উপস্থিতি—মাছ, কাঁকড়া, মধু কিংবা গোলপাতা সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত এসব ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয় বনজীবীদের।

তবে স্থানীয় বনজীবীদের দাবি, প্রকৃতির এসব ভয়কে ছাপিয়ে বর্তমানে বনদস্যু ও জলদস্যুদের আতঙ্কই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সুন্দরবনে দীর্ঘ সময় মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় গহিন বনে দস্যুদের তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বনে প্রবেশের পর অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি কিংবা প্রাণনাশের হুমকির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেক জেলেই উদ্বিগ্ন।

কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত টহলের দাবি

বনজীবীরা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে বন বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহলও জোরদার করা জরুরি।

তাদের দাবি, ১ সেপ্টেম্বর থেকে পাস-পারমিট নিয়ে শত শত নৌকা সুন্দরবনের নদী-খাল ও গহিন অরণ্যে প্রবেশ করবে। এ সময় কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল জোরদার করা হলে বনজীবীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে।

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবন খুলছে—এটি উপকূলের হাজারো বনজীবীর কাছে নতুন করে জীবিকা ফিরে পাওয়ার সুযোগ। তবে মাছ-কাঁকড়া আহরণের সুযোগের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের নিরাপদ জীবিকার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাই এখন উপকূলবাসীর অন্যতম প্রত্যাশা।