দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

এখনো নিখোঁজ যশোরের একই পরিবারের চারজন

36

দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে আনন্দভ্রমণে বেরিয়েছিলেন বাবা-মা। কথা ছিল, ঘুরে বেড়িয়ে আবার ফিরবেন আপন ঠিকানায়। কিন্তু সেই ফেরা নিয়ে এখন ঘনিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ একই পরিবারের চারজন। বন্ধ মুঠোফোন, প্রিয়জনদের কোনো খোঁজ নেই, আর রিসোর্টের শৌচাগার থেকে উদ্ধার হয়েছে পরস্পরকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় চারজনের দগ্ধ মরদেহ। সেই মরদেহগুলো কি তুহিন, তানজি ও তাঁদের দুই শিশুকন্যার? উত্তর জানা নেই স্বজনদের। যশোরের মনিরামপুরে এখন প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে বুকভরা উৎকণ্ঠা আর অজানা আশঙ্কায়।

নিখোঁজ নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১) মনিরামপুর হাসপাতাল মোড়সংলগ্ন মোহনপুর এলাকার মতিয়ার রহমানের ছেলে। তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬)। তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)। ঢাকার মিরপুরে বসবাসকারী পরিবারটি বেড়াতে গিয়েছিল কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাদের সন্ধান না মেলায় স্বজনদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। পুলিশও মনিরামপুরের একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে মরদেহগুলোর আনুষ্ঠানিক পরিচয় শনাক্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রিসোর্টে ওঠেন তুহিন। দুই দিন অবস্থান শেষে রোববার তাদের ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকেই তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পেয়ে স্বজনদের মনে দানা বাঁধে দুশ্চিন্তা। তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর স্ত্রী তানজির ফোনেও বারবার চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু সেই ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।

এরপর শুরু হয় এক অন্তহীন অপেক্ষা। কখনো ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা, কখনো পরিচিতজনদের কাছে খোঁজ নেওয়া—কোনোভাবেই মিলছিল না চারজনের সন্ধান। স্বজনদের মনে তখনো আশা ছিল, হয়তো কোথাও নিরাপদে আছেন তারা, হয়তো কোনোভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্ত পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে অজানা আশঙ্কা আরও গভীর হতে থাকে।

তুহিনের চাচাতো ভাই ও মনিরামপুর হাসপাতাল মোড়ের ওষুধ ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন জানান, তাঁদের মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থান রিসোর্ট এলাকায় দেখা যাচ্ছিল। দিনভর খোঁজাখুঁজি করেও তাঁদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

শনিবার সন্ধ্যায় রিসোর্টের শৌচাগার থেকে পরস্পরকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় চারজনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে। এরপর স্বজনদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো নিখোঁজ এই পরিবারের সদস্যদের কি না, তা নিয়ে তৈরি হয় গভীর শঙ্কা। একদিকে প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা, অন্যদিকে ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা—এই দুইয়ের মাঝে অসহায় অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা। তবে আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ ছাড়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স শনিবার থেকে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, তুহিন, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ে বেঁচে আছেন কি না, তা তাঁরা নিশ্চিত নন। কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন তিনি।

একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা মনিরামপুরের স্বজনদের জন্য দুঃসহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে সাত বছরের রুজাইনা ইনায়া আর মাত্র তিন বছরের সুনাইনা ইহানাকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেশি। যে বয়সে দুই শিশুর হাসি-খেলায় মুখর থাকার কথা পরিবার, যে বয়সে বাবা-মায়ের হাত ধরে পৃথিবীটাকে নতুন করে চেনার কথা, সেই দুই শিশুর কোনো খোঁজ নেই। তাঁদের কী হয়েছে, কোথায় আছেন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন স্বজনেরা।

তুহিনের পরিবারকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, চারজনের পরিণতি কী? যে ভ্রমণ শেষে রবিবার তাঁদের ঘরে ফেরার কথা ছিল, সেই ফেরার অপেক্ষা এখন অনিশ্চয়তায় ঢাকা। স্বজনেরা কক্সবাজারে গেছেন মরদেহ শনাক্তের জন্য। পরিচয় নিশ্চিত হলে তাদের মরদেহ নিয়ে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন নিহতদের স্বজন ও মনিরামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মজনুর রহমান। কিন্তু আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের মনে জমে থাকা শঙ্কার অবসান হচ্ছে না।

মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ জানান, কক্সবাজারে অগ্নিকাণ্ডে মনিরামপুরের চারজন মারা গেছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। স্বজনেরা সেখানে গেছেন। ডিএনএ পরীক্ষার পর তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে।