দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

উন্নয়ন পরিকল্পনায় খুলনা, জনমনে আশার আলো

কৃষক ও ফ্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহৎ উন্নয়নে সরকারের বিশেষ নজরে খুলনা

4
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খুলনা। একদিকে শিল্প ও বন্দরনির্ভর অর্থনীতি, অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও উপকূলীয় জনপদের বিপুল সম্ভাবনা। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জলবায়ু ঝুঁকি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দারিদ্র্যের চাপে পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলের প্রত্যাশা এখন নতুন করে জোরালো হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের সূচনায় খুলনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ইতিবাচক প্রত্যাশা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন ও হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এসব কর্মসূচির একটি বড় অংশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে খুলনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগও চলছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় খুলনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, এমনটাই মনে করছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় খুলনা জেলার ৯টি ইউনিয়নকে এ কর্মসূচির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ইউনিয়নের দুটি করে ব্লকে ইতোমধ্যে জরিপের কাজ শেষ হয়েছে। তৃতীয় ব্লকের জরিপ কার্যক্রমও চলছে। প্রথম দফায় নির্বাচিত ৯ ইউনিয়নের প্রায় ২৩ হাজার কৃষক কৃষক কার্ডের আওতায় আসবেন। আর বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে খুলনা জেলায় মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৬০৩ জন কৃষক এ কার্ড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

খুলনা জেলার প্রথম পর্যায়ের নির্বাচিত ইউনিয়নগুলো হলো, রূপসা উপজেলার নৈহাটি, বটিয়াঘাটা উপজেলার আমিরপুর, দিঘলিয়া উপজেলার গাজিরহাট, ফুলতলা উপজেলার সদর, ডুমুরিয়া উপজেলার ভান্ডারপাড়া, তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদাহ, দাকোপ উপজেলার সদর, পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালি এবং কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়ন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি এসব ইউনিয়নে জরিপ ও যাচাই-বাছাই করে কৃষক নির্বাচনের কাজ করছে। ইতোমধ্যে ১৮ হাজার ৪৭৯ জন কৃষকের নাম চূড়ান্ত করে ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৩ হাজার ১৫০ জন কৃষককে কার্ড পাওয়ার যোগ্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কৃষক কার্ড শুধু পরিচয়পত্র নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকছে সরাসরি আর্থিক সহায়তা। কার্ডধারী প্রত্যেক কৃষক বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরকারি অনুদান পাবেন। জনতা, সোনালী ও কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কার্ডধারী কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, কৃষি প্রশিক্ষণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, বালাই দমনে পরামর্শ, কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ, কৃষি বীমা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, ঋণ এবং বিভিন্ন কৃষি উপকরণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. তৌহিদীন ভূইয়া জানিয়েছেন, ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডটি ডেবিট কার্ড হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। একই সঙ্গে প্রতি বছর কৃষককে ২ হাজার ৫০০ টাকা অনুদান দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এর আগে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্যও খুলনায় শুরু হয়েছে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। গত ১০ মার্চ খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে প্রথম পর্যায়ে ৫ হাজার ২৭৫ জন সম্ভাব্য উপকারভোগীর মধ্যে ৪ হাজার ১৫৮ জনের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়। একই দিনে দেশের ১৪টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। কর্মসূচির মাধ্যমে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের ৪৯ ধরনের তথ্য-উপাত্ত পিএম স্কোরিংয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। খুলনায় এ দুটি কর্মসূচির পরীক্ষামূলক ও প্রাথমিক বাস্তবায়ন এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। খুলনার মানুষের প্রত্যাশা অবশ্য শুধু আর্থিক সহায়তা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান, খুলনার দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হোক। খুলনা ও এর আশপাশের জেলাগুলো কৃষি, মৎস্য, চিংড়ি, শিল্প, নৌপথ, বন্দর, পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। কিন্তু অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু ঝুঁকির কারণে এসব সম্ভাবনার পুরোপুরি ব্যবহার সম্ভব হয়নি।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে তাই একক কোনো প্রকল্প নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়ন, নদীপথ সচল রাখা, মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য ও চিংড়ি খাতের আধুনিকায়ন এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই কর্মসংস্থান। সবকিছুকে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে আনার দাবি দীর্ঘদিনের। খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে। লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব এলাকার মানুষের কৃষি ও জীবিকা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু বড় অবকাঠামো নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানি, টেকসই বাঁধ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে উপকূলের মানুষের জীবনমান দ্রুত বদলে যেতে পারে।

কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি এই বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হলে এর সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ কৃষককে শুধু নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করা গেলে কৃষি হয়ে উঠতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। খুলনার উন্নয়ন মানে শুধু খুলনা শহরের উন্নয়ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোরসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, নৌপথের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে খুলনা একটি বড় অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতে পারে। এর সরাসরি সুফল পেতে পারেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী উদ্যোগের সূচনায় খুলনার উপস্থিতি সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি যদি বৃহত্তর অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ উপকারভোগীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। খুলনার মানুষ এখন সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায়। তাদের প্রত্যাশা, উন্নয়নের তালিকায় শুধু প্রকল্পের সংখ্যা বাড়বে না, প্রকল্পের সুফলও পৌঁছাবে প্রান্তিক মানুষের ঘরে।