দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

কেশবপুরে অসময়ের পানিতে অপরিপক্ব পাট, ফলন ও দাম নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

31

কেশবপুর :

মাঠজুড়ে এখন পাট কাটার ব্যস্ততা। কোথাও কৃষক কাঁচি হাতে পাট কাটছেন, কোথাও আঁটি বাঁধছেন। আবার কেউ মাথায় কিংবা নৌকায় করে কাটা পাট নিয়ে ছুটছেন ভুড়িভদ্রা নদীর দিকে—জাগ দেওয়ার জন্য। বর্ষার পানিতে টইটম্বুর নদী-খাল ও জলাশয়গুলো এখন কেশবপুরের পাটচাষিদের ব্যস্ততার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

তবে এবারের পাট কাটার মৌসুমে স্বস্তির চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি কৃষকদের। টানা বৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি প্রবেশ করে অনেক পাটখেত ডুবে যাওয়ায় অপরিপক্ব অবস্থাতেই পাট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এতে একদিকে ফলন ও আঁশের মান কমার আশঙ্কা, অন্যদিকে পানির মধ্যে পাট কাটতে গিয়ে বাড়ছে শ্রমিকের খরচ। সব মিলিয়ে এবারের মৌসুম কৃষকদের জন্য চ্যালেঞ্জের হয়ে উঠেছে।

বুধবার (১৯ আগস্ট) কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে মাঠে পাট কাটার ধুম। কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে পাট কাটছেন, কেউ কাটা পাটের আঁটি বাঁধছেন। আবার কেউ সেই পাট নিয়ে যাচ্ছেন পাশের ভুড়িভদ্রা নদীতে জাগ দেওয়ার জন্য। একই সময়ে গ্রামের অধিকাংশ কৃষক পাট কাটায় ব্যস্ত থাকায় দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকটও।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত বীজ বপনের ১০০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে পাট পরিপক্ব হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে কেশবপুরের অনেক কৃষককে নির্ধারিত সময়ের আগেই পাট কেটে ফেলতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকায় গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। কোথাও গাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকেরা পানির মধ্যেই পাট কেটে নিচ্ছেন।

মজিদপুর গ্রামের কৃষক মজিবর রহমান এবার দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “অসময়ে পানি আসায় এবার পাটের ফলন তুলনামূলক কম হয়েছে। দীর্ঘদিন গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকায় গাছ ভালোভাবে বাড়েনি, আঁশও ভালো হয়নি।”

তিনি জানান, পাঁচ দিন ধরে পাট কাটছেন। আরও এক-দুই দিনের মধ্যে তার জমির পাট কাটা শেষ হবে। মজিদপুর ও বিনাকুড়ের মাঠে প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই পাট কাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে গ্রামের প্রায় সবাই পাট কাটায় ব্যস্ত থাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। দু-একজন শ্রমিক পাওয়া গেলেও তাদের দিতে হচ্ছে বাড়তি মজুরি।

জলাবদ্ধতার কারণে শুধু পাট কাটাই নয়, জাগ দেওয়ার কাজেও কৃষকদের বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। কাটা পাট দ্রুত পানিতে জাগ দিতে না পারলে গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পাট কাটার সঙ্গে সঙ্গেই তা নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা।

কৃষক নুর ইসলাম আলী বলেন, “পাট কাটার পর পাশের ভুড়িভদ্রা নদীতে জাগ দেওয়া হচ্ছে। নদীর পানিতে জাগ দিলে পাটের আঁশে কাঙ্ক্ষিত সোনালি রং আসে। এ কারণে আমরা সাধারণত নদীতেই পাট জাগ দিই।”

কৃষক সিদ্দিক আলী জানান, মজিদপুরের ভুড়িভদ্রা নদীতে পাট পচাতে ১৫ থেকে ১৭ দিন সময় লাগে। তবে আগের তুলনায় এবার পাটে রোগবালাই বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। এর মধ্যে বাজারে পাটের দামও কমে আসায় কৃষকদের লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পাট ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার মোড়ল বলেন, “গত বছর ভালো মানের পাট প্রতি মণ প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে প্রতি মণ পাট কেনা হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় দাম কম। ভালো মান ও ভালো ফলন পাওয়া পাটে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। তবে যাদের পাটের ফলন ও মান ভালো হয়নি, তারা এবার কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়বেন।”

কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, চলতি বছর উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৫৮৫ হেক্টর। এর বিপরীতে পাট চাষ হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। ভারী বৃষ্টির কারণে ৬৬ হেক্টর জমির পাটের ফলন কমেছে। উপজেলায় প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৮ টন পাট উৎপাদন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাট জাগ দেওয়ার সময় কাদামাটি ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে পাটের গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমে যেতে পারে। জাগ দেওয়ার সময় কংক্রিট বা উপযুক্ত ভারী বস্তু দিয়ে পাট চাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে পাট ভালোভাবে জাগ দেওয়া সম্ভব হবে এবং আঁশের মানও ভালো থাকবে।

কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কেশবপুরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ থাকলেও মৌসুমজুড়ে তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক প্রতিকূলতা—অসময়ের পানি, জলাবদ্ধতা, রোগবালাই, শ্রমিক সংকট ও বাড়তি উৎপাদন খরচ।

এর মধ্যেও মাঠে পাট কাটার ব্যস্ততা থেমে নেই। কৃষকদের আশা, ভালো মানের পাটের ন্যায্য দাম মিললে ক্ষতির চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু অপরিপক্ব পাট, কম ফলন ও বাজারদরের নিম্নমুখী প্রবণতা সেই আশার পথেও তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা।

কেশবপুরের মাঠে এখন তাই পাট কাটার পাশাপাশি চলছে হিসাব-নিকাশ—খরচ কত হলো, ফলন কত পেলেন আর বাজারে কত দামে বিক্রি হবে। নদীতে জাগ দেওয়া পাটের আঁশে কাঙ্ক্ষিত সোনালি রং ফুটে উঠলেও কৃষকের মুখে সেই সোনালি স্বস্তি কতটা ফিরবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।