দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

“জাহাজমারী খালে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের মুখে হাসি”

23

সাতক্ষীরা :

দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট কাটিয়ে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার জাহাজমারী খাল। খাল পুনঃখননের ফলে কৃষিতে ফিরেছে গতি, আর উপজেলা প্রশাসনের নতুন উন্নয়ন উদ্যোগের আশ্বাসে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন হাজারো কৃষক।

সোমবার (৩০ জুন) দুপুরে যুগিখালী ইউনিয়নের আড়খালী মসজিদ সংলগ্ন জাহাজমারী খালে কচুরিপানা অপসারণের মাধ্যমে খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম। পরে জাহাজমারী মাইক্রো ওয়াটারশেড কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি।

এক সময় খরার মৌসুমে খালটিতে পানি না থাকায় কৃষকদের গভীর নলকূপের পানি কিনে সেচ দিতে হতো। আবার বর্ষায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় শত শত বিঘা জমির ফসল তলিয়ে যেত। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে রাজকীয় নেদারল্যান্ড দূতাবাসের অর্থায়নে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও সহযোগী সংস্থা উত্তরণের বাস্তবায়নে ‘সফল ফর আইডব্লিউআরএম (IWRM)’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ সালে দলুইপুর থেকে গোছমারা লস্কার বড় খাল পর্যন্ত ২ দশমিক ৯৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জাহাজমারী খাল পুনঃখনন করা হয়।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬২৫ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুগিখালী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম। সঞ্চালনা করেন জাহাজমারী মাইক্রো ওয়াটারশেড কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম কাজল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও আরিফুল ইসলাম বলেন, খাল পুনঃখনন করাই শেষ নয়, এর নাব্যতা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকরা নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে খাল পরিষ্কার করছেন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। উপজেলা প্রশাসন সবসময় তাদের পাশে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খালের অবশিষ্ট ৭৪০ ফুট অংশ পুনঃখনন, পূর্ব পাশের সড়ক উন্নয়ন, কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য নতুন কালভার্ট নির্মাণ, প্রতিবছর খাল সংস্কারের জন্য বরাদ্দ এবং খাল ব্যবস্থাপনা কমিটিকে গাছের চারা সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য দ্রুত লিখিত আবেদন জমা দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে মফিজুল ইসলাম বলেন, জাহাজমারী খাল শুধু একটি জলাধার নয়, এটি হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। খাল সচল থাকলে কৃষি উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি এলাকার অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

খাল খনন কমিটির উপদেষ্টা আব্দুল গফুর বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পর পুনঃখননের মাধ্যমে কৃষকদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। এখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে খালটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।

ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম খাল রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ব্যক্তিগতভাবে ১০ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করেন। অপর ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন বলেন, খাল পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় এলাকার কৃষি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার কলারোয়া প্রোগ্রাম অফিসার গোলাম মশিউর রহমান বলেন, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

খাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের জানান, প্রকল্প শেষ হলেও কৃষকদের নিজস্ব তহবিল গঠন করা হয়েছে। সেই তহবিল থেকেই প্রতি বছর খাল পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে খালটি আবারও ভরাট হয়ে কৃষকদের দুর্ভোগের কারণ না হয়।

অনুষ্ঠানে কৃষকরা খালের অবশিষ্ট অংশ পুনঃখনন, সড়ক উন্নয়ন, নতুন কালভার্ট নির্মাণ, নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ এবং খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের দাবি জানান। ইউএনও এসব দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিলে কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়।

অনুষ্ঠান শেষে ছয়টি গ্রামের প্রায় ৩০ জন কৃষক কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই স্বেচ্ছাশ্রমে খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেন। কৃষকদের বিশ্বাস, প্রশাসনের সহযোগিতা, উন্নয়ন সংস্থার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে জাহাজমারী খালকে ঘিরে গড়ে উঠবে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা, বাড়বে ফসল উৎপাদন এবং সমৃদ্ধ হবে এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা।