পাইকগাছা :
সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজমের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন উদ্যোক্তারা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে খোলা চিঠি দিয়েছে পর্যটন উদ্যোক্তাদের সংগঠন রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন। সংগঠনটির দাবি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান—দুই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলের ১৮টি, সাতক্ষীরার চারটি এবং বাগেরহাটের দুটি রিসোর্ট রয়েছে। রিসোর্ট মালিকদের ১৫ ও ৩০ দিনের সময়সীমা উল্লেখ করে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বন্ধের নির্দেশ পাওয়া রিসোর্টগুলোর মধ্যে রয়েছে অরণ্য ছায়া, অরণ্য বাড়ি, কেওড়া বন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজসহ অন্যান্য স্থাপনা।
এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের প্রান্তিক এলাকার পর্যটন উদ্যোক্তাদের পক্ষে খোলা চিঠি দিয়েছেন রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সেক্রেটারি জাকারিয়া হুসাইন শাওন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সুন্দরবনসংলগ্ন ইকো-ট্যুরিজমের বাস্তবতা সরেজমিনে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
খোলা চিঠিতে জাকারিয়া হুসাইন শাওন বলেন, সুন্দরবনের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে অঞ্চলটিকে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে একদল তরুণ উদ্যোক্তা কাজ করছেন। কেউ ব্যক্তিগত সঞ্চয়, কেউ ব্যাংকঋণ, আবার কেউ পরিবারের সহায়তায় রিসোর্ট ও পর্যটনসেবা গড়ে তুলেছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের এই উদ্যোগ কেবল ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর একটি সম্ভাবনা।”
উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের পেরিফেরি এলাকায় প্রায় ১৭ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা ১৫টি রিসোর্টে বর্তমানে দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন, যাঁদের অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা। পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দোকান, বোট সার্ভিস, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং হাঁস-মুরগির খামারসহ আরও ৫৮টি ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি, বানিশান্তা ও কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় ৭ হাজার ৩০০ মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
চিঠিতে বলা হয়, পর্যটন স্থানীয় মানুষের পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটানো এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প জীবিকা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং সুস্পষ্ট নির্দেশনার সীমাবদ্ধতা উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে বলে দাবি করেন তিনি।
জাকারিয়া হুসাইন শাওন বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নে উদ্যোক্তাদের কোনো আপস নেই। তাঁরা আইন মেনে, পরিবেশগত শর্ত পূরণ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে পর্যটন পরিচালনা করতে চান। তাঁদের দাবি, বিশেষ সুবিধা নয়; বরং সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা হোক।
জঙ্গলবাড়ী ম্যানগ্রোভ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংগঠনটির সেক্রেটারি জাকারিয়া হুসাইন শাওন আরও বলেন, নীতিমালার বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা সরেজমিনে দেখার জন্য সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলো পরিদর্শন করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
খোলা চিঠিতে সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজমের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত এবং বিদ্যমান বিনিয়োগগুলোর আইনসম্মত ও স্বচ্ছ পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে, পর্যটনকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান, কর্মসংস্থান ও বিকল্প জীবিকার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের অনেকে। দাকোপের সাবেক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ফাতেমা আক্তার বলেন, প্রকৃতি ও পর্যটনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে দুটিই একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। প্রকৃতি সংরক্ষণ করেই দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।
অন্যদিকে, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা। উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, সুন্দরবনের কোলঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট গড়ে উঠলে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর আশঙ্কা, এসব স্থাপনার কারণে ঢাংমারীসহ আশপাশের নদীতে নৌযান চলাচল বাড়তে পারে, যা ডলফিনসহ জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। শব্দদূষণও বন্য প্রাণীর জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পর্যটন কার্যক্রম যাতে সরকারি নির্দেশনা ও পরিবেশগত শর্ত মেনে পরিচালিত হয়, সে জন্য প্রয়োজনে পরিবেশবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখন সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন নিয়ে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। উদ্যোক্তারা যেখানে টেকসই পর্যটনের জন্য নীতিগত সহায়তা চাইছেন, সেখানে পরিবেশকর্মীরা সুন্দরবনের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।
নোট: আপনার দেওয়া প্রতিবেদনের শেষাংশে পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ ছিল। তাই তাঁর কোনো বক্তব্য যোগ করা হয়নি। প্রকাশের আগে ২৪টি রিসোর্টের নাম, সময়সীমা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনার তথ্য মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।