দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

এই প্রথম সাতক্ষীরায় ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল, ভোরে ৪.১ মাত্রায়কেঁপে ওঠে উপকূলীয় জেলা

3

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় এই প্রথম জেলার অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল শনাক্ত হয়েছে। উপকূলীয় এই জেলায় মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৪টা ৩৬ মিনিটে ৪.১ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া এলাকায় এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। গভীরতা বেশি হওয়ায় কম্পনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আবহাওয়াবিদ জুলফিকার আলি রিপন  জানান, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া এলাকা। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। গভীরতা বেশি হওয়ায় ভূমিকম্পটির প্রভাব ছিল তুলনামূলকভাবে মৃদু। এতে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, ঢাকায় অবস্থিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের রিখটার স্কেল অনুযায়ী ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪.১। ভোর ৪টা ৩৬ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে ভূমিকম্পটি রেকর্ড করা হয়।

আবহাওয়াবিদ জুলফিকার আলি রিপন বলেন, সাতক্ষীরা জেলায় আগেও ভূমিকম্প অনুভূত হলেও কখনোই জেলার ভেতরে কেন্দ্রস্থল ছিল, এমন কোনো রেকর্ড নেই। এই প্রথম সাতক্ষীরা জেলার অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল শনাক্ত হলো।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গাউছার রেজা  বলেন, ভূমিকম্প মূলত পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে ঘটে। তবে ভারী বৃষ্টিপাত, নদীর পানি বৃদ্ধি বা ভূমির অতিরিক্ত চাপ কিছু ক্ষেত্রে ভূ-পৃষ্ঠের দুর্বল এলাকায় কম্পনের প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে।

তিনি বলেন, ভূমিকম্প হয় মূলত ভূ-অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ নির্গত হওয়ার ফলে। এ কারণে আবহাওয়া পরিবর্তন ভূমিকম্প সৃষ্টি করে না, তবে ভূমিকম্পের পর ভূমির প্রতিক্রিয়া আবহাওয়া ও পরিবেশগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।

সহকারী অধ্যাপক গাউছার রেজা আরও বলেন, সাতক্ষীরা জেলা ভূতাত্ত্বিকভাবে পলিমাটি দ্বারা গঠিত সমতল ভূমি, যা গাঙ্গেয় বদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। জেলার ভেতর দিয়ে কপোতাক্ষ, মরিচাপ, খোলপেটুয়া, বেতনা, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা, ইছামতি ও কালিন্দী-যমুনাসহ বহু নদী প্রবাহিত হয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলা, সুন্দরবন ও জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত।

তার মতে, এ ধরনের পলিমাটি ও নদীবহুল এলাকায় ভূমিকম্পের সময় মাটি তুলনামূলকভাবে নরম থাকায় কম্পনের অনুভূতি বেশি হতে পারে। তবে ভূমিকম্পের গভীরতা বেশি হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা সাধারণত কম থাকে। তবে ভবিষ্যতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ভূমি দেবে যাওয়া (লিকুইফেকশন) ও নদীতীরবর্তী এলাকায় ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাশাপাশি ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূকম্প বিজ্ঞান কেন্দ্র (EMSC) এবং ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (NCS) ভূমিকম্পটির রেকর্ড সংগ্রহ করেছে।

এদিকে ভূমিকম্পের পর কলারোয়া উপজেলার কয়েকটি এলাকায় পরিদর্শনে যান সাতক্ষীরা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুজ্জামান।

তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর সাতক্ষীরা জেলার কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে কেন্দ্রস্থল এলাকায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ইউনিটগুলোকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ভূমিকম্প একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতার মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ভূমিকম্প চলাকালে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ভূমিকম্প অনুভূত হলে আতঙ্কিত না হয়ে ঘরের ভেতরে থাকলে শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে মাথা ঢেকে আশ্রয় নিতে হবে। জানালা, কাচ, আলমারি, ঝুলন্ত ফ্যান ও ভারী বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে এবং এ সময় লিফট ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন তিনি।

বাইরে অবস্থান করলে খোলা জায়গায় সরে গিয়ে ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ ও বিলবোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যানবাহনে থাকলে গাড়ি থামিয়ে ভেতরেই অবস্থান করতে বলেন তিনি।

নদী ও উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় নদীর পাড়, বাঁধ ও সেতু থেকে দূরে সরে গিয়ে নিরাপদ উঁচু স্থানে অবস্থান করা জরুরি।