দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর আর ফেরেননি মিরাজ, চার মাসেও মেলেনি সন্ধান

31

মোংলা :

মোংলার জয়মনির ঘোলের বাসা থেকে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর বের হয়ে আর ফেরেননি মিরাজ শেখ। এরপর কেটে গেছে চার মাস। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে কোস্ট গার্ডের বক্তব্যের মিল নেই। যে জালি বোটে করে মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেই বোটের মাঝিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এরই মধ্যে আত্মসমর্পণকারী সাবেক বনদস্যু নেতা সুমন হাওলাদারের বক্তব্যে নিখোঁজের দিন সাড়ে ৬ লাখ টাকা লেনদেনের প্রসঙ্গ উঠে আসায় ঘটনায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন গত ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করা হয়, সাদা পোশাকে থাকা কোস্ট গার্ডের সদস্যরা মিরাজকে তুলে নিয়ে গেছেন। পরিবারের দাবি, পরে তাঁকে মান্নান মাঝির জালি বোটে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে মান্নান মাঝি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার সময় তিনি জালি বোটে করে জাহাজে লোক আনা-নেওয়ার কাজে ছিলেন। তাঁর বোটে মিরাজকে তোলা বা নিয়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে কোস্ট গার্ডের বক্তব্যও ভিন্ন। বিসিজি বেইজ মোংলার নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার শহীদ আল আহসান বলেন, মিরাজকে কোস্ট গার্ড আটক বা গ্রেপ্তার করেনি। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে কোস্ট গার্ডের কোনো সংশ্লিষ্টতাও নেই।

কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা জানান, মিরাজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাজমুলও মিরাজকে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিজ চোখে দেখেননি বলে জানিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, পরিবারের দাবি অনুযায়ী যদি প্রকাশ্যে মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনাস্থলে থাকা কেউ অন্তত ছবি বা ভিডিও ধারণ করলেন না কেন।

নাজমুল আরও জানান, মিরাজের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব স্বচ্ছল না হলেও তাঁর চলাফেরা ও জীবনযাপন নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ছিল। তিনি দাবি করেন, মিরাজ একসময় আত্মসমর্পণকারী সাবেক বনদস্যু সুমন হাওলাদারের বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মিরাজ ও সুমন একই এলাকার বাসিন্দা এবং তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন। সুন্দরবনে বনদস্যু হিসেবে সক্রিয় থাকার পর সুমন কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সুমন দাবি করেন, সুন্দরবনের দস্যুদের সঙ্গে মিরাজের যোগাযোগ ছিল। তাঁর দাবি, জেলের ছদ্মবেশে মিরাজ সুন্দরবনের গহিনে যাতায়াত করতেন এবং দস্যুদের কাছে অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন। তবে সুমনের এসব বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

সুমনের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সাড়ে ৬ লাখ টাকার বিষয়টি। তাঁর দাবি, সুন্দরবনের একটি জেলে বহরকে জিম্মি করে বনদস্যুরা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। ওই মুক্তিপণের সাড়ে ৬ লাখ টাকা ১০ এপ্রিল মিরাজের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। একই দিন মিরাজ নিখোঁজ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মিরাজ কি ওই টাকা পৌঁছে দিতে কোথাও গিয়েছিলেন? টাকাটি কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল? নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে ওই অর্থের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

মিরাজকে উদ্ধারের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাঁর বাবা মোস্তফা শেখ হাইকোর্টে রিট করলে গত ১২ জুলাই আদালত মিরাজকে উদ্ধার করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

মিরাজের নিখোঁজের ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দ্রুত তদন্ত ও মিরাজের সন্ধান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রও তাঁকে দ্রুত খুঁজে বের করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে এসব সংগঠনের বক্তব্য মিরাজকে কারা নিখোঁজ করেছে, তা প্রমাণ করে না; তারা মূলত কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, মিরাজের নিখোঁজের ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ১০ এপ্রিলের সেই সন্ধ্যা। মিরাজ কোথা থেকে বের হয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁর মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল, মান্নান মাঝির জালি বোট তখন কোথায় ছিল, কারা তাঁকে শেষবার দেখেছিলেন এবং সুমনের দাবি করা সাড়ে ৬ লাখ টাকার সঙ্গে মিরাজের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই করা জরুরি।

একদিকে পরিবারের অভিযোগ, অন্যদিকে কোস্ট গার্ডের অস্বীকার। পরিবারের দাবি করা জালি বোটের মাঝি বলছেন, মিরাজ তাঁর বোটে ওঠেননি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও তাঁকে তুলে নেওয়ার ঘটনা দেখেননি। আবার আত্মসমর্পণকারী সাবেক বনদস্যু নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে মিরাজের কথিত দস্যু-যোগ এবং নিখোঁজের দিনের সাড়ে ৬ লাখ টাকার প্রসঙ্গ।

সব মিলিয়ে চার মাস পরও মিরাজ শেখের নিখোঁজের রহস্যের সমাধান হয়নি। ১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর তিনি কোথায় গেলেন—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে তাঁর পরিবার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টরা।