দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

মিষ্টি-গাজী নজরুলের আগে বিতর্কে জড়ানো এমপিদের পরিণতি কী হয়েছিল

43

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর পর এ পর্যন্ত ভিন্ন ঘটনায় দুই সংসদ সদস্য বিতর্কে জড়িয়েছেন। তাঁরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলটি তাঁর বহিষ্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়নি।

অন্যদিকে, রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাম আসার পর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তাঁর পদত্যাগের পর সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের বিতর্কে জড়ানো, দল থেকে বহিষ্কার কিংবা পদত্যাগের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন কারণে কয়েকজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়েছে। আবার দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও অনেকের সংসদ সদস্য পদ বহাল থেকেছে। দলবদল বা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে অতীতে কয়েকজনের আসন শূন্য হওয়ার নজিরও রয়েছে।

লতিফ সিদ্দিকী

টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দেওয়া বক্তব্যের কারণে ব্যাপক বিতর্কে জড়ান। এর পর তাঁকে মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

দেশে ফেরার পর তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় কারাগারে ছিলেন। তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

মুরাদ হাসান

২০২১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ও জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও ও বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

এর পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় পদ থেকেও বহিষ্কৃত হন। তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট হলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন।

গোলাম মাওলা রনি

আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি ২০১৩ সালে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের দুই সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। পরবর্তী নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসনে দলটির মনোনয়ন পান।

মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল। কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে ২০২০ সালের জুনে তিনি কুয়েতে গ্রেপ্তার হন।

পরে ঘুষ লেনদেনের মামলায় কুয়েতের আদালত তাঁকে কারাদণ্ড দেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। ফলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান।

আবুল কাশেম

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন আবুল কাশেম। তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপির অভিযোগ তুলে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ২০১২ সালে আপিল বিভাগ তাঁর আপিল খারিজ করলে সংসদ সদস্য পদও বাতিল হয়ে যায়।

মহীউদ্দীন খান আলমগীর

চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বিরুদ্ধে আগের একটি দণ্ডের বিষয় সামনে আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হলেও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে।

মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন

২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন। তাঁর সরকারি চাকরি থেকে অবসরের সময় ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন ওঠে।

পরবর্তী আইনি লড়াইয়ে আদালত তাঁর সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় তাঁর আসন শূন্য হয়। পরবর্তী সময়ে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আসনটি শূন্য ছিল।

হাসিবুর রহমান স্বপন

সিরাজগঞ্জ-৭ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত হাসিবুর রহমান স্বপন ১৯৯৮ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং উপমন্ত্রী হন। দল পরিবর্তনের কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান।

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন

রাজশাহী-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন একপর্যায়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হন। দল পরিবর্তনের কারণে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি আবার সংসদ সদস্য হন।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও জাহিদুর রহমান

২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ২০১৯ সালের মার্চে সংসদে শপথ নেন। পরে তাঁকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই বছরের এপ্রিলে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানও শপথ নিলে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তবে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাহিদুর রহমানের বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করা হয়।

এইচ এম গোলাম রেজা

২০০৮ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির এইচ এম গোলাম রেজা। জীবনবৃত্তান্ত ও সংসদে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ২০১২ সালে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দল থেকে বহিষ্কারের পরও তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

আবু হেনা

অষ্টম জাতীয় সংসদে রাজশাহী-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত হন সাবেক আমলা আবু হেনা। ২০০৫ সালে তিনি প্রকাশ্যে তৎকালীন বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। পরে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তবে তৎকালীন স্পিকার সিদ্ধান্ত দেন, দল থেকে বহিষ্কারের কারণে আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে না।

আইনি কাঠামো

সংসদ সদস্যের আসন কোন কোন পরিস্থিতিতে শূন্য হতে পারে, তা সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শপথ না নেওয়া, সংসদের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকা, নির্দিষ্ট ধরনের ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণসহ অন্যান্য সাংবিধানিক অযোগ্যতা।

এ ছাড়া কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। আর কোনো সংসদ সদস্য নিজে পদত্যাগ করতে চাইলে স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন।