দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

ভেপিংয়ের আড়ালে মাদকের বিস্তার বাংলাদেশে- সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের নতুন ঝুঁকি

88

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপিং ডিভাইসের মাধ্যমে একটি নতুন ও ভয়াবহ নেশাজাতীয় উপাদানের বিস্তারের প্রমাণ মিলেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জব্দকৃত নমুনা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব ভেপিং লিকুইডে MDMB-4en-PINACA নামের একটি শক্তিশালী সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড মিশিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সাধারণ গাঁজা বা প্রাকৃতিক ক্যানাবিসজাত দ্রব্য নয়; বরং ল্যাবে তৈরি এমন এক রাসায়নিক যৌগ, যার প্রভাব বহু গুণ বেশি এবং প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত অনির্দেশ্য।

MDMB-4en-PINACA আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি Synthetic Cannabinoid Receptor Agonist (SCRA)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউরোপীয় মনিটরিং সংস্থা EMCDDA-এর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এই শ্রেণির পদার্থগুলো মানব মস্তিষ্কের CB₁ রিসেপ্টরের ওপর অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে কাজ করে। ফলে অল্প মাত্রাতেই তীব্র সাইকোঅ্যাকটিভ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এই ধরনের সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড প্রাকৃতিক THC-এর তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিষাক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেপিং ডিভাইসকে এই মাদকের বাহন হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ভেপিং লিকুইড স্বচ্ছ বা সুগন্ধিযুক্ত হওয়ায় সহজেই এতে রাসায়নিক মেশানো যায় এবং ব্যবহারকারীর পক্ষে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া ই-সিগারেট এখনো অনেকের কাছে “কম ক্ষতিকর” বা “ধূমপানের বিকল্প” হিসেবে পরিচিত। এই ভুল ধারণাকে কাজে লাগিয়েই অপরাধচক্র তরুণ ও শিক্ষার্থীসমাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরকারি সূত্রে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধারকৃত কিছু ভেপিং কার্ট্রিজ ও লিকুইডের উৎস বিদেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ। যদিও সুনির্দিষ্ট সব সরবরাহচেইন প্রকাশ্যে আসেনি, তবে আন্তর্জাতিক মাদক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের উৎপাদন ও পাচার নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গতিশীল এবং নিয়মিত রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করে আইন ফাঁকি দেয়।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, MDMB-4en-PINACA ব্যবহারের ফলে তীব্র উদ্বেগ, বিভ্রম, হ্যালুসিনেশন, আচরণগত অস্বাভাবিকতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, খিঁচুনি এমনকি আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে পারে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো—এই পদার্থ ব্যবহারের পর অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা বা সাইকোসিসের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ভেপিংয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করলে দ্রুত ফুসফুস হয়ে এটি রক্তে মিশে যায়, ফলে প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এই প্রবণতা এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে বাংলাদেশে একটি “নীরব মাদক মহামারি” তৈরি হতে পারে। কারণ ভেপিং ডিভাইস সহজলভ্য, তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সামাজিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে কম সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর বিস্তার ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য, অপরাধপ্রবণতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

যদিও বাংলাদেশে ই-সিগারেট আমদানি ও বিপণনের বিষয়ে কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের মতো নতুন রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করা আইন ও ফরেনসিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এই ধরনের মাদক দমনে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী ল্যাব সক্ষমতা, নিয়মিত রাসায়নিক নজরদারি এবং জনসচেতনতা।

অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কাস্টমস ও স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত উদ্যোগে ভেপিং লিকুইড পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। চিকিৎসকদের জন্যও সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড বিষক্রিয়া শনাক্ত ও চিকিৎসার নির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রয়োজন।

ভেপিংয়ের আড়ালে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডের বিস্তার নিছক একটি মাদক সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকেত। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সাম্প্রতিক দেশীয় উদ্ধার তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়- এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সময় থাকতেই নীতি, আইন ও সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নীরব বিপদ ঠেকাতে।

লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশকর্মী