দৈনিক খুলনা
The news is by your side.

বৃষ্টিভেজা পথ, এক ছাতা আর মানবিকতার গল্প

গাবুরার শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে কাস্টমস কর্মকর্তার অনন্য উদ্যোগ

142

খুলনা: 

সাতক্ষীরা জেলার সর্বদক্ষিণে শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। নদী, জোয়ার-ভাটা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই এখানকার মানুষের জীবনযাপন। অধিকাংশ মানুষ জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল কিংবা বনজীবী। দারিদ্র্য যেন এখানকার নিত্যসঙ্গী। কাঁচা-কাদাময় রাস্তা পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। কয়েক বছর আগে বিদ্যুতের আলো পৌঁছালেও জীবনের অন্ধকার এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

এই ইউনিয়নের মাঝখানে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় গাবুরা গোপাল-লক্ষ্মী মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে প্রায় ২৪০ জন শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছে। সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান প্রশংসনীয়। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩২ জন শিক্ষার্থীই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে।

তবে ভালো ফলাফলের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য হৃদয়বিদারক বাস্তবতা।

গত ৬ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার দিনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসএম ইয়াছমিনুর রহমান লিংকন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ নিষ্ঠুর বাস্তবতা’ শিরোনামে একটি হৃদয়স্পর্শী স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি তুলে ধরেন প্রতিদিনের সেই নির্মম চিত্র, যা শহরের মানুষের কল্পনারও বাইরে।

বর্ষাকালে প্রায় ছয় কিলোমিটার কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হয় তাঁকে। সেদিনও মাথায় ছাতা আর হাঁটু পর্যন্ত গুটানো প্যান্ট পরে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন। পথেই চোখে পড়ে একদল ছাত্রী প্রাণপণে দৌড়ে স্কুলে আসছে। আকাশে ঘন কালো মেঘ, যে কোনো মুহূর্তে নামবে প্রবল বর্ষণ। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ছাত্রীর মধ্যে মাত্র কয়েকজনের হাতে ছাতা, বাকিরা সম্পূর্ণ অসহায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। এক ছাতার নিচে দুই-তিনজন করে আশ্রয় নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। এমন সময় এক ছাত্রী লজ্জাভরা কণ্ঠে শিক্ষককে বলে, “স্যার, আপনার ছাতার মধ্যে আমাকে একটু নিবেন?”

প্রধান শিক্ষক তাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে পৌঁছান। পরে যাদের ছাতা ছিল না, তাদের কারণ জানতে চাইলে প্রথমে কেউ উত্তর দেয়নি। একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থী মাথা নিচু করে জানায়, স্যার, বাড়িতে মাত্র একটা ছাতা। ছোট ভাই প্রাইমারি স্কুলে নিয়ে গেছে। বাবা গামছা মুড়ি দিয়ে কাজে গেছেন। তাই আমি শুধু ফাইলের ভেতর কলম আর অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে বের হয়েছি।

এই উত্তর শুনে নির্বাক হয়ে যান শিক্ষক। শাসনের ভাষা হারিয়ে ফেলেন তিনি। ভেজা কাপড়েই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। শিক্ষক শুধু বলতে পারেন, যাও, ক্লাসে গিয়ে ফ্যানের নিচে বসো, হয়তো কিছুটা কাপড় শুকাবে।

এই হৃদয়স্পর্শী লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই নাড়া দেয় অসংখ্য মানুষকে। তাঁদেরই একজন যশোরের বেনাপোলে কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন।

গাবুরার সন্তান রুহুল আমিন স্ট্যাটাসটি পড়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বুঝে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ৫০টি আধুনিক ছাতা উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরদিনই খুলনা থেকে ছাতাগুলো কিনে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন।

রবিবার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হাতে সেই ছাতাগুলো তুলে দেন। মুহূর্তেই আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেক শিক্ষার্থীর চোখে আনন্দের অশ্রু।

এক শিক্ষার্থী অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি, আমাদের কষ্টের কথা শুনে কেউ এত দ্রুত ছাতা পাঠাতে পারে। আমাদের এলাকার বড় ভাই-বোনেরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় আছেন। তাদের এমন মানবিকতা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

তবে নিজের এই উদ্যোগকে কোনো দান বা সহায়তা হিসেবে দেখতে চান না রুহুল আমিন। তিনি বলেন, আমি এগুলো খুব গোপনে দিতে চেয়েছিলাম। এটি কোনো সহায়তা নয়, বড় ভাইয়ের পক্ষ থেকে ছোট ভাই-বোনদের জন্য ছোট্ট একটি উপহার। সবাই দোয়া করবেন, যেন এভাবে মানুষের পাশে থাকতে পারি।

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, মানবিকতার জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু একটি সংবেদনশীল হৃদয়। যেখানে একটি ছাতার অভাবে শিক্ষার্থীদের ভিজে কাপড়ে পরীক্ষা দিতে হয়, সেখানে ৫০টি ছাতা শুধু বৃষ্টির হাত থেকেই রক্ষা করেনি, তাদের মনে জাগিয়েছে ভালোবাসা, সাহস আর আশার আলো।

গাবুরার কাদামাখা পথ হয়তো এখনো আগের মতোই আছে। দুর্যোগও থামেনি। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে- একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগও অসংখ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। আর এমন মানবিক গল্পই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ এখনো সুন্দর, কারণ কিছু মানুষ এখনো নীরবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানেন।