কেশবপুর :
যশোরের কেশবপুর উপজেলার বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের হাড়িয়ার গোপ গ্রামের হাজরা ও বেনাকুড়া বিল এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মাছের ঘেরের বেড়ি কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছে উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে প্রশাসনের অভিযানে ঘেরের বেড়ি কেটে দেওয়া হয়। এতে পানি বের হওয়ার পথ তৈরি হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে পানিবন্দী পরিবার ও কৃষকদের মধ্যে।
এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ঘেরের পানি আটকে রাখার অভিযোগে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, তালা উপজেলার শিরাশুনি গ্রামের মো. আবু বক্কার মোলঙ্গীর ছেলে আতিয়ার মোলঙ্গীর মাছের ঘেরের পানি আটকে থাকায় হাজরা ও বেনাকুড়া বিল এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে আশপাশের বসতবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ার পাশাপাশি বিস্তীর্ণ কৃষিজমি জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে এলাকার প্রায় ৩ হাজার বিঘা জমিতে ধান চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী মৌসুমে সরিষা চাষ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন পানি আটকে থাকায় জমির স্বাভাবিক চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে এবং বসতবাড়িতেও দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি প্রশাসনকে জানালে পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের সমন্বয়ে ঘেরের বেড়ি কেটে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন কেশবপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুর রহমান শেখ, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা, কেশবপুর থানা পুলিশের সদস্য, আনসার-ভিডিপির সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, এলাকাবাসী ও সাংবাদিকরা।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুর রহমান শেখ বলেন, স্থানীয় মানুষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখা হয়েছে। দীর্ঘদিন পানি আটকে থাকার কারণে মানুষের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে ঘেরের বেড়ি কেটে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল, বসতবাড়ি এবং কৃষিজমির ক্ষতি করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে অভিযোগের ভিত্তিতে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘেরের বেড়ি কেটে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। তাঁদের আশা, দ্রুত পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো আবার চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ধান কাটার পর এসব জমিতে সরিষা ও অন্যান্য রবি ফসল আবাদ করা যাবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার ওপর।
কেশবপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস বলেন, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে কোনো ঘের পরিচালনা করা হলে তার প্রভাব আশপাশের কৃষিজমি ও জনবসতির ওপর পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতেই ঘেরের বেড়ি কেটে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাছের ঘের পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা প্রয়োজন। ঘেরের কারণে যাতে কৃষিজমি, রাস্তা কিংবা মানুষের বসতবাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে পানি সরিয়ে দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিলের পানি নিষ্কাশনের খাল, নালা ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ সচল রাখার পাশাপাশি ঘের স্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
কেশবপুরে বিল ও জলাবদ্ধতার সমস্যা নতুন নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে অপরিকল্পিত মাছের ঘের ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার কারণে কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে জলাবদ্ধতার অভিযোগ উঠেছে।
হাড়িয়ার গোপের হাজরা ও বেনাকুড়া বিল এলাকার স্থানীয়দের মূল দাবি, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ স্থায়ীভাবে সচল রাখা এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো ঘেরের কারণে আবারও কয়েক হাজার বিঘা কৃষিজমি জলাবদ্ধ না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।